বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জেলা সুনামগঞ্জ। নদী, হাওর, পাহাড়ি ছড়া ও সীমান্তঘেঁষা
প্রকৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ এই জনপদ। বর্ষাকালে যেখানে গ্রামগুলো দ্বীপের মতো
জেগে থাকে, আর শুষ্ক মৌসুমে সোনালি ধানের চাদরে ঢেকে যায় বিস্তীর্ণ প্রান্তর। এই
জনপদ শুধু প্রকৃতির জন্যই বিখ্যাত নয়; ইতিহাস, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন ও
রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও সুনামগঞ্জের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য।
এই ঐতিহ্যের ধারক-বাহকদের
মধ্যে অন্যতম এক উজ্জ্বল নাম নাছির উদ্দীন চৌধুরী। ভাটির জনপদের বিস্তীর্ণ হাওর
অঞ্চল থেকে উঠে আসা এই মানুষটি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি একটি ইতিহাস, একটি
আন্দোলন, একটি বিশ্বাসের নাম। মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, আস্থা ও শ্রদ্ধা তাঁকে
বারবার অধিষ্ঠিত করেছে সম্মানজনক স্থানে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি
অধ্যায় যেন সংগ্রাম, সাহস, ত্যাগ ও জনসেবার এক অনন্য দলিল।
১৯৫০ সালের ২ জুন দিরাই
উপজেলার কুলঞ্জ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাছির উদ্দীন
চৌধুরী। পিতা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ও মাতা আফতারুন নেছা খানমের স্নেহে বেড়ে ওঠা এই
মানুষটি শৈশব থেকেই ছিলেন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। অভিজাত পরিবারের
সন্তান হয়েও তিনি কখনো সাধারণ মানুষের জীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। বরং
অত্যাচারিত, বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের কাতারে দাঁড়াতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
তাঁর ছাত্রজীবন বাংলাদেশের
ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায়। নাছির উদ্দীন চৌধুরী ছাত্রাবস্থায় ছাত্র
ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি পরপর তিনটি কলেজে ছাত্র সংসদের
গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়ে যে নজির স্থাপন করেছেন, তা আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে।
১৯৬৬ সালে সিলেট এমসি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়ে তিনি তরুণ বয়সেই
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময়
তিনি ছিলেন সম্মুখসারির এক নির্ভীক যোদ্ধা। আইয়ুব খানের জনসভা পণ্ড করে দেয়ার
ঘটনায় তাঁর সাহসিকতা সে সময় ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল।
এই ঘটনার কারণে তাঁকে গ্রেফতার
হতে হয়, ছয় মাস কারাভোগ করতে হয় এবং এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়। কিন্তু
সংগ্রামী মানুষ কখনো পরাজয় মানেন না। বহিষ্কার তাঁকে দমাতে পারেনি। তিনি ভর্তি হন
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে এবং ১৯৬৮ সালে ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। সেখানেও
শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ায় আবারও বহিষ্কারের শিকার হন। এরপর মৌলভীবাজার
সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৭০ সালে ভিপি নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে ছাত্রসমাজ
নতুন দিশা খুঁজে পায়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও
তিনি পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত
করা, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহে সহযোগিতা করা এবং গেরিলা যোদ্ধাদের বিভিন্ন
সেক্টরে পাঠানোর কাজে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবনকে
ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে তিনি লড়েছেন দেশের মানুষের মুক্তির জন্য।
স্বাধীনতার পর তিনি আরও ঘনিষ্ঠ
হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষের। মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনসংগ্রামের
সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে তোলেন। ১৯৮৫ ও ১৯৮৯ সালে দু’বার দিরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তিনি
জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজের দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য,
যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
রাজনীতির জাতীয় অঙ্গনে তাঁর
উত্থানও ছিল ব্যতিক্রমী। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির
প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা সুরঞ্জিত
সেনগুপ্তকে পরাজিত করে সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত
হন। সেই বিজয় ছিল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক আলোচিত ঘটনা।
সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি শুধু
বক্তৃতা দেননি; মানুষের সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। হাওরাঞ্চলে
চুরি, নিরাপত্তাহীনতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। এমনকি
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজেই পাহারাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার
ঘটনাও আজ কিংবদন্তির অংশ হয়ে গেছে।
২০০১ সালে বিএনপি’র রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেন।
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথে তিনি হয়ে ওঠেন সুনামগঞ্জের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা।
জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক থাকাকালে টানা
আন্দোলনের সময় ৯৩ দিনের মধ্যে ৯২ দিন রাজপথে কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি
বিরল রাজনৈতিক ইতিহাস গড়েন। যখন দেশের অনেক জায়গায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা মাঠে
নামতেই ভয় পেতেন, তখন তিনি আগাম কর্মসূচি ঘোষণা করে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে
দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু পদ-পদবি দিয়ে তাঁর পরিচয়কে সীমাবদ্ধ করা যায় না। কারণ
তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন একজন মানবিক নেতা হিসেবে।
ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের
বিভাজন কখনো তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ কিংবা
খ্রিস্টান-সকল সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে তিনি সমানভাবে শ্রদ্ধেয়। দিরাই-শাল্লার
মানুষের মুখে মুখে তাঁর পরিচয়- “মজলুম মানুষের নেতা, “গরিবের বন্ধু”, “ভাটিবন্ধু”।
তাঁর বাড়ির দরজা আজও সবসময় খোলা থাকে অসহায়, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের জন্য।
জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক
অধ্যায়গুলোর একটি রচিত হয়েছে সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। শারীরিক প্রতিকূলতা
সত্ত্বেও হুইলচেয়ারে বসে নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিয়ে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। এটি শুধু
একটি নির্বাচনী বিজয় নয়; এটি মানুষের ভালোবাসার বিজয়, বিশ্বাসের বিজয় এবং একজন
নেতার প্রতি জনগণের অটুট আস্থার বিজয়। তিনি প্রমাণ করেছেন-রাজনীতিতে অর্থ, প্রভাব
কিংবা ক্ষমতার চেয়েও বড় শক্তি হলো মানুষের ভালোবাসা।
সময়ের স্রোতে অনেক নেতা আসেন,
অনেক নেতা হারিয়ে যান। কিন্তু কিছু মানুষ ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকেন মানুষের হৃদয়ে।
নাছির উদ্দীন চৌধুরী সেই বিরল মানুষদের একজন। তিনি শুধু একটি নাম নন; তিনি ভাটির
মানুষের সংগ্রাম, সাহস, আত্মবিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রতীক।
হয়তো একদিন সময়ের ক্যালেন্ডার
আরও অনেক পাতা উল্টাবে। নতুন নতুন নেতা আসবেন, নতুন ইতিহাস রচিত হবে। কিন্তু
দিরাই-শাল্লার হাওরের ঢেউ, গ্রামের মেঠোপথ আর সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে একটি
নাম বারবার উচ্চারিত হবে-নাছির উদ্দীন চৌধুরী।
কারণ কিছু মানুষ ক্ষমতার কারণে
বড় হন না, পদ-পদবির কারণে স্মরণীয় হন না। তারা বড় হন মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়ার
মাধ্যমে। নাছির উদ্দীন চৌধুরী তেমনই এক মানুষ, যিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার সিঁড়ি নয়,
মানুষের সেবার ব্রত হিসেবে দেখেছেন।
ভাটির জনপদের আকাশে যতদিন হাওরের বাতাস বইবে, যতদিন মানুষের মুখে সংগ্রামের গল্প শোনা যাবে, ততদিন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উচ্চারিত হবে একটি নাম-নাছির উদ্দীন চৌধুরী; ভাটির মানুষের নেতা, মানুষের হৃদয়ের মানুষ।

বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জেলা সুনামগঞ্জ। নদী, হাওর, পাহাড়ি ছড়া ও সীমান্তঘেঁষা
প্রকৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ এই জনপদ। বর্ষাকালে যেখানে গ্রামগুলো দ্বীপের মতো
জেগে থাকে, আর শুষ্ক মৌসুমে সোনালি ধানের চাদরে ঢেকে যায় বিস্তীর্ণ প্রান্তর। এই
জনপদ শুধু প্রকৃতির জন্যই বিখ্যাত নয়; ইতিহাস, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন ও
রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও সুনামগঞ্জের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য।
এই ঐতিহ্যের ধারক-বাহকদের
মধ্যে অন্যতম এক উজ্জ্বল নাম নাছির উদ্দীন চৌধুরী। ভাটির জনপদের বিস্তীর্ণ হাওর
অঞ্চল থেকে উঠে আসা এই মানুষটি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি একটি ইতিহাস, একটি
আন্দোলন, একটি বিশ্বাসের নাম। মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, আস্থা ও শ্রদ্ধা তাঁকে
বারবার অধিষ্ঠিত করেছে সম্মানজনক স্থানে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি
অধ্যায় যেন সংগ্রাম, সাহস, ত্যাগ ও জনসেবার এক অনন্য দলিল।
১৯৫০ সালের ২ জুন দিরাই
উপজেলার কুলঞ্জ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাছির উদ্দীন
চৌধুরী। পিতা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ও মাতা আফতারুন নেছা খানমের স্নেহে বেড়ে ওঠা এই
মানুষটি শৈশব থেকেই ছিলেন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। অভিজাত পরিবারের
সন্তান হয়েও তিনি কখনো সাধারণ মানুষের জীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। বরং
অত্যাচারিত, বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের কাতারে দাঁড়াতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
তাঁর ছাত্রজীবন বাংলাদেশের
ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায়। নাছির উদ্দীন চৌধুরী ছাত্রাবস্থায় ছাত্র
ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি পরপর তিনটি কলেজে ছাত্র সংসদের
গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়ে যে নজির স্থাপন করেছেন, তা আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে।
১৯৬৬ সালে সিলেট এমসি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়ে তিনি তরুণ বয়সেই
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময়
তিনি ছিলেন সম্মুখসারির এক নির্ভীক যোদ্ধা। আইয়ুব খানের জনসভা পণ্ড করে দেয়ার
ঘটনায় তাঁর সাহসিকতা সে সময় ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল।
এই ঘটনার কারণে তাঁকে গ্রেফতার
হতে হয়, ছয় মাস কারাভোগ করতে হয় এবং এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়। কিন্তু
সংগ্রামী মানুষ কখনো পরাজয় মানেন না। বহিষ্কার তাঁকে দমাতে পারেনি। তিনি ভর্তি হন
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে এবং ১৯৬৮ সালে ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। সেখানেও
শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ায় আবারও বহিষ্কারের শিকার হন। এরপর মৌলভীবাজার
সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৭০ সালে ভিপি নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে ছাত্রসমাজ
নতুন দিশা খুঁজে পায়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও
তিনি পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত
করা, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহে সহযোগিতা করা এবং গেরিলা যোদ্ধাদের বিভিন্ন
সেক্টরে পাঠানোর কাজে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবনকে
ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে তিনি লড়েছেন দেশের মানুষের মুক্তির জন্য।
স্বাধীনতার পর তিনি আরও ঘনিষ্ঠ
হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষের। মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনসংগ্রামের
সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে তোলেন। ১৯৮৫ ও ১৯৮৯ সালে দু’বার দিরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তিনি
জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজের দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য,
যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
রাজনীতির জাতীয় অঙ্গনে তাঁর
উত্থানও ছিল ব্যতিক্রমী। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির
প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা সুরঞ্জিত
সেনগুপ্তকে পরাজিত করে সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত
হন। সেই বিজয় ছিল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক আলোচিত ঘটনা।
সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি শুধু
বক্তৃতা দেননি; মানুষের সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। হাওরাঞ্চলে
চুরি, নিরাপত্তাহীনতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। এমনকি
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজেই পাহারাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার
ঘটনাও আজ কিংবদন্তির অংশ হয়ে গেছে।
২০০১ সালে বিএনপি’র রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেন।
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথে তিনি হয়ে ওঠেন সুনামগঞ্জের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা।
জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক থাকাকালে টানা
আন্দোলনের সময় ৯৩ দিনের মধ্যে ৯২ দিন রাজপথে কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি
বিরল রাজনৈতিক ইতিহাস গড়েন। যখন দেশের অনেক জায়গায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা মাঠে
নামতেই ভয় পেতেন, তখন তিনি আগাম কর্মসূচি ঘোষণা করে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে
দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু পদ-পদবি দিয়ে তাঁর পরিচয়কে সীমাবদ্ধ করা যায় না। কারণ
তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন একজন মানবিক নেতা হিসেবে।
ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের
বিভাজন কখনো তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ কিংবা
খ্রিস্টান-সকল সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে তিনি সমানভাবে শ্রদ্ধেয়। দিরাই-শাল্লার
মানুষের মুখে মুখে তাঁর পরিচয়- “মজলুম মানুষের নেতা, “গরিবের বন্ধু”, “ভাটিবন্ধু”।
তাঁর বাড়ির দরজা আজও সবসময় খোলা থাকে অসহায়, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের জন্য।
জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক
অধ্যায়গুলোর একটি রচিত হয়েছে সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। শারীরিক প্রতিকূলতা
সত্ত্বেও হুইলচেয়ারে বসে নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিয়ে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। এটি শুধু
একটি নির্বাচনী বিজয় নয়; এটি মানুষের ভালোবাসার বিজয়, বিশ্বাসের বিজয় এবং একজন
নেতার প্রতি জনগণের অটুট আস্থার বিজয়। তিনি প্রমাণ করেছেন-রাজনীতিতে অর্থ, প্রভাব
কিংবা ক্ষমতার চেয়েও বড় শক্তি হলো মানুষের ভালোবাসা।
সময়ের স্রোতে অনেক নেতা আসেন,
অনেক নেতা হারিয়ে যান। কিন্তু কিছু মানুষ ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকেন মানুষের হৃদয়ে।
নাছির উদ্দীন চৌধুরী সেই বিরল মানুষদের একজন। তিনি শুধু একটি নাম নন; তিনি ভাটির
মানুষের সংগ্রাম, সাহস, আত্মবিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রতীক।
হয়তো একদিন সময়ের ক্যালেন্ডার
আরও অনেক পাতা উল্টাবে। নতুন নতুন নেতা আসবেন, নতুন ইতিহাস রচিত হবে। কিন্তু
দিরাই-শাল্লার হাওরের ঢেউ, গ্রামের মেঠোপথ আর সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে একটি
নাম বারবার উচ্চারিত হবে-নাছির উদ্দীন চৌধুরী।
কারণ কিছু মানুষ ক্ষমতার কারণে
বড় হন না, পদ-পদবির কারণে স্মরণীয় হন না। তারা বড় হন মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়ার
মাধ্যমে। নাছির উদ্দীন চৌধুরী তেমনই এক মানুষ, যিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার সিঁড়ি নয়,
মানুষের সেবার ব্রত হিসেবে দেখেছেন।
ভাটির জনপদের আকাশে যতদিন হাওরের বাতাস বইবে, যতদিন মানুষের মুখে সংগ্রামের গল্প শোনা যাবে, ততদিন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উচ্চারিত হবে একটি নাম-নাছির উদ্দীন চৌধুরী; ভাটির মানুষের নেতা, মানুষের হৃদয়ের মানুষ।

প্রধান সম্পাদক: চঞ্চল মাহমুদ ফুলর
সম্পাদক: এম এ ওমর
প্রকাশক: জি.সি দাস
আপনার মতামত লিখুন