পঞ্চবাণী

খবরের পিছনের খবর



খবরের পিছনের খবর

ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কিছু খবর প্রায়ই চোখে পড়ে। খবরগুলো কয়েকদিন দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিলেও পরে হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে। কিন্তু থেকে যায় কিছু প্রশ্ন, কিছু অজানা কষ্ট, কিছু ভাঙা সংসার আর কিছু নীরব দীর্ঘশ্বাস।

খবরগুলোর শিরোনামও হয় অত্যন্ত চমকপ্রদ—

“স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন”,

“প্রবাসীর স্ত্রী পরকীয়া প্রেমিকসহ আটক”,

“স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামীর আত্মহত্যা”,

“সন্তান রেখে পরকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে উধাও গৃহবধূ”—

এমন নানা শিরোনাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ বাড়ায়, আর গণমাধ্যমে সৃষ্টি করে সাময়িক আলোচনার ঝড়। কিন্তু এসব ঘটনার গভীরে থাকা সামাজিক, মানসিক ও পারিবারিক কারণ নিয়ে খুব কমই বিশ্লেষণ হয়।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতি-আবেগী সম্পর্ক গড়ে ওঠা এবং পারিবারিক দূরত্ব—এসব বিষয় অনেক পরিবারে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর দূরত্ব, প্রবাসজীবনের একাকীত্ব, পারিবারিক অবহেলা কিংবা পারস্পরিক অবিশ্বাস অনেক সময় ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয় একটি পরিবারকে।

অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাঝখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বন্ধুত্ব, সহানুভূতি কিংবা আবেগের নামে প্রবেশ করে। শুরুতে বিষয়টি সাধারণ সম্পর্ক মনে হলেও ধীরে ধীরে তা আবেগ, প্রলোভন ও মানসিক নির্ভরতার দিকে গড়ায়। আর সেখান থেকেই সৃষ্টি হয় সন্দেহ, দূরত্ব ও পারিবারিক অশান্তি। অনেক ক্ষেত্রে এই তৃতীয় পক্ষই একটি সুন্দর সংসার ভাঙনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে অত্যন্ত পবিত্র, গভীর ও সম্মানজনক হিসেবে দেখা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দাম্পত্য সম্পর্ককে শান্তি, ভালোবাসা ও রহমতের বন্ধন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাই এই সম্পর্কের মধ্যে অযাচিত হস্তক্ষেপ, গোপন সম্পর্ক বা আবেগের অপব্যবহার ইসলাম সমর্থন করে না।

স্বামী-স্ত্রীর জীবনে দুঃখ, কষ্ট, অভিমান কিংবা মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই দুর্বল মুহূর্তে বাইরের কারও অতিরিক্ত আবেগ, মায়া বা ঘনিষ্ঠতা অনেক সময় সম্পর্ককে ভুল পথে নিয়ে যায়। একজন বিবাহিত নারী বা পুরুষ যখন নিজের দাম্পত্য সমস্যার সমাধান সঙ্গীর পরিবর্তে অন্য কারও কাছে খুঁজতে শুরু করেন, তখন সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে পরিবার, সমাজ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

বাস্তবতা হলো, তৃতীয় পক্ষের এই ধরনের সম্পর্ক শুধু একজন স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষতি করে না; বরং এর প্রভাব পড়ে সন্তান, পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং পুরো সমাজের ওপর। অনেক সময় মানুষ সাময়িক আবেগে বুঝতে পারেন না যে, যে ব্যক্তি আজ সহানুভূতির হাত বাড়াচ্ছে, সেই মানুষটিই একসময় একটি সংসার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সাংবাদিক মানবাধিকার সংস্থার এক জরিপে উঠে আসে, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পর্কের কারণে অনেক নারী ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ স্বামী-সন্তান ত্যাগ করে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন, আবার অনেকেই প্রতারণা, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব নারী সন্তান রেখে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের জীবনের পরিণতি অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ হয়েছে বলেও জরিপে উল্লেখ করা হয়।

আইনি দিক:

বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় আগে পরকীয়া সম্পর্ককে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেখানে স্বামীর অভিযোগের ভিত্তিতে পরকীয়া প্রেমিকের বিরুদ্ধে মামলা করা যেত, যদিও নারীর জন্য আলাদা শাস্তির বিধান ছিল না। এছাড়া ৪৯৩ ধারায় প্রতারণামূলকভাবে বৈবাহিক সম্পর্কের বিশ্বাস সৃষ্টি করে সহবাসের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব আইন নিয়ে নানা বিতর্ক ও বাস্তব প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।

বাস্তবতা হলো, একটি সম্পর্ক ভাঙলে শুধু একজন নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো পরিবার, সন্তান, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজ। অনেক পুরুষ আইনের জটিলতা, সামাজিক লজ্জা কিংবা মানসিক ভাঙনের কারণে নীরবে কষ্ট সহ্য করেন। আবার অনেক নারীও আবেগ আর প্রলোভনের কারণে ভুল সিদ্ধান্তের পথে হাঁটেন। তাই কেবল একপক্ষকে দায়ী না করে পারিবারিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা এবং মানসিক সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

একটি সুন্দর সংসার বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন সেখানে অবিশ্বাস, গোপন সম্পর্ক ও প্রতারণা ঢুকে পড়ে, তখন ধ্বংস হয় শুধু দুইজন মানুষ নয়—একটি পুরো পরিবার।

চলবে…

লেখক:

এম.এ ওমর

সভাপতি, বিয়ানীবাজার জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন, কার্যকরী সদস্য, বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব

আপনার মতামত লিখুন

পঞ্চবাণী

বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬


খবরের পিছনের খবর

প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬

featured Image

ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কিছু খবর প্রায়ই চোখে পড়ে। খবরগুলো কয়েকদিন দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিলেও পরে হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে। কিন্তু থেকে যায় কিছু প্রশ্ন, কিছু অজানা কষ্ট, কিছু ভাঙা সংসার আর কিছু নীরব দীর্ঘশ্বাস।

খবরগুলোর শিরোনামও হয় অত্যন্ত চমকপ্রদ—

“স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন”,

“প্রবাসীর স্ত্রী পরকীয়া প্রেমিকসহ আটক”,

“স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামীর আত্মহত্যা”,

“সন্তান রেখে পরকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে উধাও গৃহবধূ”—

এমন নানা শিরোনাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ বাড়ায়, আর গণমাধ্যমে সৃষ্টি করে সাময়িক আলোচনার ঝড়। কিন্তু এসব ঘটনার গভীরে থাকা সামাজিক, মানসিক ও পারিবারিক কারণ নিয়ে খুব কমই বিশ্লেষণ হয়।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতি-আবেগী সম্পর্ক গড়ে ওঠা এবং পারিবারিক দূরত্ব—এসব বিষয় অনেক পরিবারে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর দূরত্ব, প্রবাসজীবনের একাকীত্ব, পারিবারিক অবহেলা কিংবা পারস্পরিক অবিশ্বাস অনেক সময় ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয় একটি পরিবারকে।

অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাঝখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বন্ধুত্ব, সহানুভূতি কিংবা আবেগের নামে প্রবেশ করে। শুরুতে বিষয়টি সাধারণ সম্পর্ক মনে হলেও ধীরে ধীরে তা আবেগ, প্রলোভন ও মানসিক নির্ভরতার দিকে গড়ায়। আর সেখান থেকেই সৃষ্টি হয় সন্দেহ, দূরত্ব ও পারিবারিক অশান্তি। অনেক ক্ষেত্রে এই তৃতীয় পক্ষই একটি সুন্দর সংসার ভাঙনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে অত্যন্ত পবিত্র, গভীর ও সম্মানজনক হিসেবে দেখা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দাম্পত্য সম্পর্ককে শান্তি, ভালোবাসা ও রহমতের বন্ধন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাই এই সম্পর্কের মধ্যে অযাচিত হস্তক্ষেপ, গোপন সম্পর্ক বা আবেগের অপব্যবহার ইসলাম সমর্থন করে না।

স্বামী-স্ত্রীর জীবনে দুঃখ, কষ্ট, অভিমান কিংবা মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই দুর্বল মুহূর্তে বাইরের কারও অতিরিক্ত আবেগ, মায়া বা ঘনিষ্ঠতা অনেক সময় সম্পর্ককে ভুল পথে নিয়ে যায়। একজন বিবাহিত নারী বা পুরুষ যখন নিজের দাম্পত্য সমস্যার সমাধান সঙ্গীর পরিবর্তে অন্য কারও কাছে খুঁজতে শুরু করেন, তখন সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে পরিবার, সমাজ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

বাস্তবতা হলো, তৃতীয় পক্ষের এই ধরনের সম্পর্ক শুধু একজন স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষতি করে না; বরং এর প্রভাব পড়ে সন্তান, পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং পুরো সমাজের ওপর। অনেক সময় মানুষ সাময়িক আবেগে বুঝতে পারেন না যে, যে ব্যক্তি আজ সহানুভূতির হাত বাড়াচ্ছে, সেই মানুষটিই একসময় একটি সংসার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সাংবাদিক মানবাধিকার সংস্থার এক জরিপে উঠে আসে, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পর্কের কারণে অনেক নারী ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ স্বামী-সন্তান ত্যাগ করে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন, আবার অনেকেই প্রতারণা, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব নারী সন্তান রেখে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের জীবনের পরিণতি অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ হয়েছে বলেও জরিপে উল্লেখ করা হয়।

আইনি দিক:

বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় আগে পরকীয়া সম্পর্ককে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেখানে স্বামীর অভিযোগের ভিত্তিতে পরকীয়া প্রেমিকের বিরুদ্ধে মামলা করা যেত, যদিও নারীর জন্য আলাদা শাস্তির বিধান ছিল না। এছাড়া ৪৯৩ ধারায় প্রতারণামূলকভাবে বৈবাহিক সম্পর্কের বিশ্বাস সৃষ্টি করে সহবাসের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব আইন নিয়ে নানা বিতর্ক ও বাস্তব প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।

বাস্তবতা হলো, একটি সম্পর্ক ভাঙলে শুধু একজন নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো পরিবার, সন্তান, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজ। অনেক পুরুষ আইনের জটিলতা, সামাজিক লজ্জা কিংবা মানসিক ভাঙনের কারণে নীরবে কষ্ট সহ্য করেন। আবার অনেক নারীও আবেগ আর প্রলোভনের কারণে ভুল সিদ্ধান্তের পথে হাঁটেন। তাই কেবল একপক্ষকে দায়ী না করে পারিবারিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা এবং মানসিক সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

একটি সুন্দর সংসার বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন সেখানে অবিশ্বাস, গোপন সম্পর্ক ও প্রতারণা ঢুকে পড়ে, তখন ধ্বংস হয় শুধু দুইজন মানুষ নয়—একটি পুরো পরিবার।

চলবে…

লেখক:

এম.এ ওমর

সভাপতি, বিয়ানীবাজার জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন, কার্যকরী সদস্য, বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব


পঞ্চবাণী

প্রধান সম্পাদক: চঞ্চল মাহমুদ ফুলর

সম্পাদক: এম এ ওমর

প্রকাশক: জি.সি দাস


ঢাকা অফিস: ফকিরবানু ভবন (২য় তলা), ১৯ হাটখোলা রোড, ওয়ারী, ঢাকা-১২০০, সিলেট অফিস : ২/১২ লেইছ সুপার মার্কেট, স্টেশন রোড, সিলেট। মোবাইল : +৮৮০১৭১১-৩২৩৪৬২, +৮৮০১৭২৯-৬৫৫২৬৫, +৮৮০১৭১৩-৮০০৭৭৩