গর্ভাবস্থায় বমি (Morning Sickness) ও হোমিওপ্যাথিক ঔষধের লক্ষণসমূহ
গর্ভাবস্থার প্রথম
তিন মাসে বমি বমি ভাব ও বমি খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। হরমোনগত পরিবর্তন, বিশেষ করে
hCG ও Estrogen হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এ সমস্যা দেখা দেয়। অধিকাংশ
ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক হলেও অতিরিক্ত বমি, খাবার বা পানি ধরে রাখতে না পারা, ওজন কমে
যাওয়া বা ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
Nux Vomica
Nux Vomica সাধারণত
সেইসব গর্ভবতী নারীর জন্য বিবেচনা করা হয় যাদের সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বমিভাব
বেশি থাকে। অল্প খাবার খেলেই পেট ভারী লাগে, অম্লতা, টক ঢেকুর এবং গ্যাস্ট্রিকের
সমস্যার সঙ্গে বমি বমি ভাব দেখা দেয়। রোগীর বারবার বমি করতে ইচ্ছা হলেও সহজে বমি
হয় না এবং বমি করেও তেমন আরাম পাওয়া যায় না। মশলাযুক্ত, তৈলাক্ত বা ভারী খাবার
খেলেই সমস্যা বেড়ে যায়। মানসিকভাবে রোগী খিটখিটে মেজাজের, রাগী ও অতিসংবেদনশীল হয়ে
পড়ে। কোষ্ঠকাঠিন্য, অসম্পূর্ণ মলত্যাগের অনুভূতি, পেটে জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তিও এর
গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
Sepia
Sepia সেইসব
ক্ষেত্রে উপযোগী বলে বিবেচিত হয় যেখানে গর্ভাবস্থার বমি দীর্ঘস্থায়ী এবং খাবারের
গন্ধ, বিশেষ করে রান্নার গন্ধ সহ্য করা যায় না। খালি পেটে বমিভাব বেশি থাকে, তবে
কিছু খেলে সাময়িক স্বস্তি অনুভূত হয়। মুখে টক বা তিতা স্বাদ থাকতে পারে। রোগী
শারীরিকভাবে ক্লান্ত, দুর্বল ও অবসন্ন থাকে এবং মানসিকভাবে পরিবারের সদস্যদের
প্রতিও উদাসীনতা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় তলপেটে ভারীভাব বা নিচের দিকে চাপ
অনুভূত হয়, যাকে bearing down sensation বলা হয়।
Ipecacuanha (Ipecac)
Ipecac-এর প্রধান
বৈশিষ্ট্য হলো অবিরাম বমি বমি ভাব, যা বমি করার পরও কমে না। রোগী ক্রমাগত বমিভাব
অনুভব করে এবং খাবারের গন্ধেই বমি বেড়ে যায়। জিহ্বা সাধারণত পরিষ্কার থাকে, যা এই
ঔষধের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। মুখে অতিরিক্ত লালা জমা হতে পারে এবং পানির পিপাসা
কম থাকে। গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে তীব্র morning sickness-এর ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো
দেখা যেতে পারে।
Cocculus Indicus
যেসব গর্ভবতী নারীর
বমিভাবের সঙ্গে মাথা ঘোরা ও চলাফেরাজনিত অসুস্থতা (motion sickness) থাকে, তাদের
ক্ষেত্রে Cocculus Indicus-এর লক্ষণ পাওয়া যায়। গাড়িতে চলাফেরা, নড়াচড়া বা
হাঁটাহাঁটি করলে বমি ও মাথা ঘোরা বেড়ে যায়। রোগী অত্যন্ত দুর্বল, অবসন্ন ও
সংবেদনশীল বোধ করে। রাত জাগা বা ঘুমের অভাবের পর লক্ষণ বৃদ্ধি পায়। খালি পেটে
বমিভাব এবং উঠলে বা হাঁটলে মাথা ঘোরার সঙ্গে বমি হওয়া এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
Colchicum
Colchicum-এর
ক্ষেত্রে খাবারের গন্ধের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীলতা দেখা যায়। রান্নার গন্ধ,
খাবারের চিন্তা কিংবা খাবার দেখলেও বমি শুরু হতে পারে। রোগীর পাকস্থলীতে তীব্র
অস্বস্তি, গ্যাস, পেট ফাঁপা এবং দুর্বলতা থাকে। সামান্য কিছু খেলেও অবস্থা খারাপ
হয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত বমির কারণে রোগী দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিশ্রামের
প্রয়োজন অনুভব করে।
Pulsatilla
Pulsatilla সাধারণত
কোমল, আবেগপ্রবণ ও সহজে কেঁদে ফেলা স্বভাবের রোগীদের সঙ্গে সম্পর্কিত। বমিভাব সকাল
ও সন্ধ্যায় বেশি থাকে এবং খালি পেটে বাড়তে পারে। চর্বিযুক্ত, তৈলাক্ত বা ভারী
খাবার সহ্য হয় না। মুখে টক বা তিতা স্বাদ থাকতে পারে। রোগী খোলা বাতাসে আরাম পায়
কিন্তু বন্ধ বা গরম ঘরে অস্বস্তি অনুভব করে। লক্ষণগুলো পরিবর্তনশীল প্রকৃতির হয়—একদিন
একরকম, পরদিন অন্যরকম। তৃষ্ণা সাধারণত কম থাকলেও মুখ ও গলা শুকনো অনুভূত হতে পারে।
Asarum Europaeum
Asarum Europaeum-এর
রোগীরা গন্ধের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। খাবারের গন্ধ এমনকি খাবারের কথা
চিন্তা করলেও বমিভাব শুরু হতে পারে। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে প্রায় সব খাবারই বমি
হয়ে বেরিয়ে আসে। রোগী মানসিকভাবে অস্থির, বিরক্ত ও অতিসংবেদনশীল থাকে। অনেক সময় বমির
সঙ্গে মাথা ঘোরা ও দুর্বলতা থাকে এবং বমি হওয়ার পর মাথাব্যথা কিছুটা কমে যায়।
স্নায়বিক উত্তেজনা ও অদ্ভুত ভাসমান অনুভূতিও থাকতে পারে।
Jatropha Curcas
Jatropha Curcas
মূলত সেইসব অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত যেখানে তীব্র বমির পাশাপাশি প্রচুর পানির মতো
পাতলা পায়খানা হয়। বমি ও ডায়রিয়া একসঙ্গে থাকলে শরীরে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দিতে
পারে। রোগী অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে, শরীর ঠান্ডা অনুভূত হয় এবং পেটে গড়গড় শব্দ বা
ফাঁপাভাব থাকতে পারে। বমির পর সাময়িক স্বস্তি এলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই পুনরায় বমি
শুরু হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ
সতর্কতা
গর্ভাবস্থায় যেকোনো
ঔষধ—হোমিওপ্যাথিক, হারবাল বা অ্যালোপ্যাথিক—চিকিৎসকের
পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়। অতিরিক্ত বমি, ওজন কমে যাওয়া, প্রস্রাব কম হওয়া,
মাথা ঘোরা বা পানি শূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।
কারণ এটি Hyperemesis Gravidarum নামক গুরুতর অবস্থার লক্ষণ হতে পারে।
গর্ভাবস্থায়
কতবার চেকআপ করা দরকার?
বর্তমান
মাতৃস্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী গর্ভবতী মায়ের অন্তত ৮টি ANC (Antenatal
Care) চেকআপ করা উত্তম।
১ম চেকআপ:
গর্ভধারণের প্রথম ১২ সপ্তাহের মধ্যে।
২য় চেকআপ: ২০ সপ্তাহে।
৩য় চেকআপ: ২৬ সপ্তাহে।
৪র্থ চেকআপ: ৩০ সপ্তাহে।
৫ম চেকআপ: ৩৪ সপ্তাহে।
৬ষ্ঠ চেকআপ: ৩৬ সপ্তাহে।
৭ম চেকআপ: ৩৮ সপ্তাহে।
৮ম চেকআপ: ৪০ সপ্তাহে।
প্রতিটি চেকআপে
রক্তচাপ, ওজন, রক্তশূন্যতা, প্রস্রাব পরীক্ষা, শিশুর বৃদ্ধি, টিটেনাস টিকা,
আয়রন-ফলিক এসিড সেবন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির লক্ষণ মূল্যায়ন করা উচিত।