১১:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

৮ লাখের বাজেট ৮ হাজার কোটি টাকা

print news -

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন ৮২ বছর বয়সী অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এটি তার প্রথম বাজেট। বাজেট উপস্থাপন করতে অর্থমন্ত্রীর জন্য ৩২৯ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতা তৈরি করা হয়েছে। তবে এই বিশাল বাজেট বক্তৃতা অর্থমন্ত্রীকে পুরোটা পড়তে হবে না। তিনি তার এই বাজেটের সারাংশ সøাইডের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করবেন। তবে প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে আগের ধারাবাহিকতা রাখা হয়েছে। এই বাজেটে খুব বেশি পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে নতুন এই বাজেটের আকার খুব বেশি বাড়ানো হয়নি। মূলত কৃচ্ছ্র অথবা অর্থ সঙ্কটই এর পেছনে দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে নতুন বাজেটের আকারটি চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে চার শতাংশের একটু বেশি। কিন্তু সচরাচর বাজেটের এই প্রবৃদ্ধি ১৩-১৪ ভাগ হয়ে থাকে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন অর্থবছরের জন্য সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে, তাতে ঘাটতিই থাকবে দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এই বিশাল পরিমাণ ঘাটতি পূরণে কয়েকটি খাতকে উৎস হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। এই খাত থেকে মোটা দাগে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হচ্ছে। এর বাইরে বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য বিদেশ থেকে এক লাখ ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকার সহায়তা পাওয়া যাবে বলেও ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ কোটি টাকার প্রকল্প ঋণও রয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাংক বহির্ভূত খাত হিসেবে বিবেচিত সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়া হবে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। জানা গেছে, নতুন অর্থবছরে মোট রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে যা ছিল ৫ লাখ কোটি টাকা। রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ শতাংশ। নতুন রাজস্ব প্রাপ্তির মধ্যে বরাবরের মতো এবারও বেশির ভাগ আয় করার দায়িত্বটি থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এনবিআরকে রাজস্ব আয়ের টার্গেট দেয়া হয়েছে চার লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। নন-এনবিআর থেকে আসবে আরো ১৫ হাজার কোটি টাকা। আর কর ব্যতীত প্রাপ্তির টার্গেট থাকছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
যদিও দীর্ঘদিন থেকে আয়-ব্যয়ের বিপুল ঘাটতি রেখে বাজেট দিতে হচ্ছে সরকারকে। তবুও প্রতি বছরই বাড়ছে বাজেটের আকার। যার প্রভাব পড়ছে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। কেননা বাজেটের বড় একটা অংশ আসে নাগরিকদের দেয়া কর থেকে। অবশ্য বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ খুব একটা নেই। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আমলা কিংবা প্রভাবশালীদের প্রভাব বেশি থাকায় অনেক সময় সাধারণ মানুষ তাদের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখেন না বলে মনে করছেন কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ।
অর্থনীতিবিদ ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, জনগণের প্রতিনিধিদের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। যে কারণে তাদের চাহিদার তেমন কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না বাজেটে। তবে কর আরোপ, কর্মসংস্থান, করমুক্ত আয়সীমা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের মতো বিষয়গুলোর কারণে বাজেটে নজর থাকে সাধারণ মানুষের।
বাজটের বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, আগামী ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটই হবে কিভাবে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায়। ওই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে কিভাবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা যায়, সেটা বড় বিষয়। বিগত দিনের ধারা লক্ষ করলে দেখা যায় রাজস্ব ঘাটতি আগের মতোই চলমান থাকবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ
এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে চার শতাংশের একটু বেশি। মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দিতে গিয়ে বাজেটের আকার বাড়াতে পারেনি সরকার।
হিসাব মতে, গত ১৪ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে বার বারই সরকারের পক্ষ থেকে আশার কথা শোনানো হচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে পারছে না সরকার। লাগাম টেনে ধরতে না পারার এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছে অর্থ বিভাগ। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট বক্তৃতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অর্থমন্ত্রী কী বলবেন সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রাজস্ব আদায় চ্যালেঞ্জ
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে পাঁচ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি মেটাতে পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা বেশি। আর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি।
২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের বাজেটে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল এনবিআরকে। পরে এনবিআরের চাপাচাপিতে লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করে দেয়। তবে লক্ষ্যমাত্রা কমানো হলেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে এখনও অনেক দূরে অবস্থান করছে প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুসারে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে মোট ২ লাখ ৮৯ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে রাজস্ব বোর্ড। এই সময়ের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। ঘাটতি ২৪ হাজার ২০৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। রাজস্ব আদায়ে ১৫ দশমিক ৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঢের পিছিয়ে প্রতিষ্ঠানটি। যদি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হয় (৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা) তাহলে অর্থবছরের বাকি দুই মাস মে ও জুনে এনবিআরকে ৯৬ হাজার ৪১৬ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্ব আহরণে সক্ষমতা বিবেচনা না করেই প্রতি বছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংস্থানে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে সরকার। এ অবস্থায় আজ পেশ করতে যাওয়া প্রস্তাবিত বাজেটে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন এনবিআর সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ের মধ্যে আমদানি-রফতানি শুল্কে আহরণ হয়েছে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ৮২ হাজার ৫২২ কোটি ২৮ লাখ টাকা, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে ১৬ দশমিক ০১ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৮১ লাখ এবং আয়করে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে আহরণ ৯৩ হাজার ১৪৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে সিপিডি মনে করছে, চলতি ২০২৩-২০২৪ অর্থবছর শেষে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। অর্থবছর শেষে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৮২ হাজার কোটি টাকা।
ঋণনির্ভরতা
প্রায় এক-তৃতীয়াংশের মতো অর্থ ধার করে আসন্ন অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। টাকার অংকে এই বাজেট ঘাটতির পরিমাণ আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি, যা জিডিপির ৫ শতাংশের কিছুটা কম। এর বড় অংশই স্থানীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ করে মেটানো হবে। যদিও ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘাটতি মেটাতে ঋণনির্ভরতা অর্থনীতিতে চাপ বাড়াবে।
আসন্ন অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকার একটি বাজেট তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেখানে আয়ের লক্ষ্য ৫ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার। সেই হিসাবে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকাই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। চলতি সংশোধিত বাজেটে যা আছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ৭ গুণ আর ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৯ গুণ। আসন্ন বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি, সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চায় সরকার। আর নিট বিদেশি ঋণের লক্ষ্য প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।
রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা
উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় পৃথিবীর অনেক দেশ সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বব্যাপী সুদের হার বৃদ্ধি পায়। আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি রোধে সুদের হার বৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলোর পুঁজি প্রবাহকে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে একদিকে উন্নয়নশীল দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে এবং নিজস্ব মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটছে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে সরকারের মধ্য মেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে (এমটিবিএফ)। বর্তমানে প্রকৃত বা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি
আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে যা ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। পরে তা কমিয়ে সাড়ে ৬ শতাংশ করা হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে বড়জোর ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রায় কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। নতুন অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ধরা হয়েছে দুই লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে যা ছিল দুই লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ১৮ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে এডিপির আকার করা হয়েছে দুই লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

ট্যাগঃ
জনপ্রিয় সংবাদ

বন্যা পরিস্থিতির অবনতি সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রাম

৮ লাখের বাজেট ৮ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশিত হয়েছেঃ ১০:১৮:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ জুন ২০২৪
print news -

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন ৮২ বছর বয়সী অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এটি তার প্রথম বাজেট। বাজেট উপস্থাপন করতে অর্থমন্ত্রীর জন্য ৩২৯ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতা তৈরি করা হয়েছে। তবে এই বিশাল বাজেট বক্তৃতা অর্থমন্ত্রীকে পুরোটা পড়তে হবে না। তিনি তার এই বাজেটের সারাংশ সøাইডের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করবেন। তবে প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে আগের ধারাবাহিকতা রাখা হয়েছে। এই বাজেটে খুব বেশি পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে নতুন এই বাজেটের আকার খুব বেশি বাড়ানো হয়নি। মূলত কৃচ্ছ্র অথবা অর্থ সঙ্কটই এর পেছনে দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে নতুন বাজেটের আকারটি চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে চার শতাংশের একটু বেশি। কিন্তু সচরাচর বাজেটের এই প্রবৃদ্ধি ১৩-১৪ ভাগ হয়ে থাকে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন অর্থবছরের জন্য সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে, তাতে ঘাটতিই থাকবে দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এই বিশাল পরিমাণ ঘাটতি পূরণে কয়েকটি খাতকে উৎস হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। এই খাত থেকে মোটা দাগে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হচ্ছে। এর বাইরে বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য বিদেশ থেকে এক লাখ ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকার সহায়তা পাওয়া যাবে বলেও ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ কোটি টাকার প্রকল্প ঋণও রয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাংক বহির্ভূত খাত হিসেবে বিবেচিত সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়া হবে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। জানা গেছে, নতুন অর্থবছরে মোট রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে যা ছিল ৫ লাখ কোটি টাকা। রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ শতাংশ। নতুন রাজস্ব প্রাপ্তির মধ্যে বরাবরের মতো এবারও বেশির ভাগ আয় করার দায়িত্বটি থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এনবিআরকে রাজস্ব আয়ের টার্গেট দেয়া হয়েছে চার লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। নন-এনবিআর থেকে আসবে আরো ১৫ হাজার কোটি টাকা। আর কর ব্যতীত প্রাপ্তির টার্গেট থাকছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
যদিও দীর্ঘদিন থেকে আয়-ব্যয়ের বিপুল ঘাটতি রেখে বাজেট দিতে হচ্ছে সরকারকে। তবুও প্রতি বছরই বাড়ছে বাজেটের আকার। যার প্রভাব পড়ছে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। কেননা বাজেটের বড় একটা অংশ আসে নাগরিকদের দেয়া কর থেকে। অবশ্য বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ খুব একটা নেই। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আমলা কিংবা প্রভাবশালীদের প্রভাব বেশি থাকায় অনেক সময় সাধারণ মানুষ তাদের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখেন না বলে মনে করছেন কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ।
অর্থনীতিবিদ ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, জনগণের প্রতিনিধিদের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। যে কারণে তাদের চাহিদার তেমন কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না বাজেটে। তবে কর আরোপ, কর্মসংস্থান, করমুক্ত আয়সীমা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের মতো বিষয়গুলোর কারণে বাজেটে নজর থাকে সাধারণ মানুষের।
বাজটের বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, আগামী ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটই হবে কিভাবে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায়। ওই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে কিভাবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা যায়, সেটা বড় বিষয়। বিগত দিনের ধারা লক্ষ করলে দেখা যায় রাজস্ব ঘাটতি আগের মতোই চলমান থাকবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ
এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে চার শতাংশের একটু বেশি। মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দিতে গিয়ে বাজেটের আকার বাড়াতে পারেনি সরকার।
হিসাব মতে, গত ১৪ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে বার বারই সরকারের পক্ষ থেকে আশার কথা শোনানো হচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে পারছে না সরকার। লাগাম টেনে ধরতে না পারার এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছে অর্থ বিভাগ। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট বক্তৃতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অর্থমন্ত্রী কী বলবেন সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রাজস্ব আদায় চ্যালেঞ্জ
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে পাঁচ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি মেটাতে পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা বেশি। আর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি।
২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের বাজেটে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল এনবিআরকে। পরে এনবিআরের চাপাচাপিতে লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করে দেয়। তবে লক্ষ্যমাত্রা কমানো হলেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে এখনও অনেক দূরে অবস্থান করছে প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুসারে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে মোট ২ লাখ ৮৯ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে রাজস্ব বোর্ড। এই সময়ের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। ঘাটতি ২৪ হাজার ২০৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। রাজস্ব আদায়ে ১৫ দশমিক ৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঢের পিছিয়ে প্রতিষ্ঠানটি। যদি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হয় (৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা) তাহলে অর্থবছরের বাকি দুই মাস মে ও জুনে এনবিআরকে ৯৬ হাজার ৪১৬ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্ব আহরণে সক্ষমতা বিবেচনা না করেই প্রতি বছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংস্থানে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে সরকার। এ অবস্থায় আজ পেশ করতে যাওয়া প্রস্তাবিত বাজেটে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন এনবিআর সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ের মধ্যে আমদানি-রফতানি শুল্কে আহরণ হয়েছে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ৮২ হাজার ৫২২ কোটি ২৮ লাখ টাকা, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে ১৬ দশমিক ০১ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৮১ লাখ এবং আয়করে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে আহরণ ৯৩ হাজার ১৪৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে সিপিডি মনে করছে, চলতি ২০২৩-২০২৪ অর্থবছর শেষে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। অর্থবছর শেষে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৮২ হাজার কোটি টাকা।
ঋণনির্ভরতা
প্রায় এক-তৃতীয়াংশের মতো অর্থ ধার করে আসন্ন অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। টাকার অংকে এই বাজেট ঘাটতির পরিমাণ আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি, যা জিডিপির ৫ শতাংশের কিছুটা কম। এর বড় অংশই স্থানীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ করে মেটানো হবে। যদিও ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘাটতি মেটাতে ঋণনির্ভরতা অর্থনীতিতে চাপ বাড়াবে।
আসন্ন অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকার একটি বাজেট তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেখানে আয়ের লক্ষ্য ৫ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার। সেই হিসাবে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকাই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। চলতি সংশোধিত বাজেটে যা আছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ৭ গুণ আর ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৯ গুণ। আসন্ন বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি, সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চায় সরকার। আর নিট বিদেশি ঋণের লক্ষ্য প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।
রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা
উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় পৃথিবীর অনেক দেশ সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বব্যাপী সুদের হার বৃদ্ধি পায়। আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি রোধে সুদের হার বৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলোর পুঁজি প্রবাহকে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে একদিকে উন্নয়নশীল দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে এবং নিজস্ব মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটছে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে সরকারের মধ্য মেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে (এমটিবিএফ)। বর্তমানে প্রকৃত বা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি
আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে যা ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। পরে তা কমিয়ে সাড়ে ৬ শতাংশ করা হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে বড়জোর ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রায় কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। নতুন অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ধরা হয়েছে দুই লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে যা ছিল দুই লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ১৮ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে এডিপির আকার করা হয়েছে দুই লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা।