উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
ডাঃ গোপাল চন্দ্র দাস, ডি.এইচ.এম.এস (বি.এইচ.এম.ই.সি),ঢাকা ||
স্ক্যাবিস (খোসপাঁচড়া) কী?স্ক্যাবিস বা খোসপাঁচড়া একটি অত্যন্ত সংক্রামক চর্মরোগ, যা Sarcoptes scabiei নামক অতি ক্ষুদ্র পরজীবী মাইটের কারণে হয়। এই মাইট ত্বকের উপরিভাগের নিচে সুড়ঙ্গ তৈরি করে বসবাস করে এবং সেখানে ডিম পাড়ে। মাইট, ডিম ও তাদের বর্জ্যের বিরুদ্ধে শরীরের অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়ার ফলে তীব্র চুলকানি ও ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এটি শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক, নারী-পুরুষ—সবারই হতে পারে।কীভাবে ছড়ায়?খোসপাঁচড়া সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘসময় ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শে থাকলে ছড়ায়। একই বিছানা, কাপড়, তোয়ালে, কম্বল বা বালিশ ব্যবহার করলেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে দ্রুত অন্য সদস্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। বিদ্যালয়, হোস্টেল, বৃদ্ধাশ্রম, শ্রমিক আবাসন ও জনাকীর্ণ পরিবেশে এর বিস্তার বেশি দেখা যায়।লক্ষণসমূহস্ক্যাবিসের সবচেয়ে প্রধান লক্ষণ হলো তীব্র চুলকানি, যা সাধারণত রাতে বেশি বৃদ্ধি পায়। ত্বকে ছোট ছোট লাল দানা, ফুসকুড়ি, পানিভরা ক্ষুদ্র ফোস্কা বা পুঁজযুক্ত ক্ষত দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ত্বকে সরু আঁকাবাঁকা সাদা বা ধূসর রেখার মতো সুড়ঙ্গের চিহ্ন দেখা যায়, যা মাইটের চলাচলের পথ নির্দেশ করে।রোগটি সাধারণত আঙুলের ফাঁক, কবজি, কনুই, বগল, কোমর, নাভির চারপাশ, নিতম্ব, যৌনাঙ্গ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা, মুখমণ্ডল, হাতের তালু ও পায়ের তলাতেও দেখা যেতে পারে। অতিরিক্ত চুলকানোর ফলে ক্ষতস্থান সংক্রমিত হয়ে পুঁজ, ঘা বা চামড়া মোটা হয়ে যেতে পারে।খোসপাঁচড়া (Scabies)-এ ব্যবহৃত কিছু পরিচিত হোমিওপ্যাথিক ঔষধের লক্ষণভিত্তিক আলোচনাSulphur (সালফার)সালফারকে হোমিওপ্যাথিতে "চর্মরোগের রাজা" বলা হয়। যেসব রোগীর তীব্র চুলকানি থাকে, বিশেষ করে রাতে বিছানার গরমে বা গোসলের পর চুলকানি বেড়ে যায়, তাদের ক্ষেত্রে সালফার বিবেচনা করা হয়। চুলকানোর পর আক্রান্ত স্থানে জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়। ত্বক সাধারণত শুষ্ক, রুক্ষ এবং অপরিচ্ছন্ন দেখায়। রোগী প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা রাখে এবং শরীর গরম প্রকৃতির হয়ে থাকে।Psorinum (সোরিনাম)সোরিনামকে "সোরার রানী" বলা হয়। যেসব রোগীর চুলকানি অত্যন্ত তীব্র এবং অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাদের ক্ষেত্রে এই ঔষধের কথা ভাবা হয়। চুলকাতে চুলকাতে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে রক্ত বের হতে পারে। রোগীর শরীর, ঘাম, প্রস্রাব কিংবা মলের দুর্গন্ধ প্রকট হতে পারে। রোগী সাধারণত শীতকাতুরে হয় এবং ঠান্ডা আবহাওয়ায় সমস্যা বৃদ্ধি পায়। মুখমণ্ডল তৈলাক্ত, নোংরা ভাবযুক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য থাকতে পারে।Arsenicum Album (আর্সেনিকাম অ্যালবাম)যেসব রোগীর চুলকানির সঙ্গে তীব্র জ্বালাপোড়া থাকে এবং গরম সেঁক বা গরম পরিবেশে আরাম লাগে, তাদের ক্ষেত্রে আর্সেনিকাম অ্যালবাম বিবেচিত হতে পারে। রোগী সাধারণত অস্থির, উদ্বিগ্ন এবং রোগমুক্তি নিয়ে হতাশাগ্রস্ত থাকে। রাতের দিকে উপসর্গ বেড়ে যায়। পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ও শৃঙ্খলাপরায়ণ স্বভাব এই ঔষধের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়।Hepar Sulphuris Calcareum (হেপার সালফ)খোসপাঁচড়ার ক্ষতস্থানে যদি পুঁজ তৈরি হয়, স্পর্শ করলে ব্যথা লাগে এবং সামান্য ঠান্ডা বাতাসেও সমস্যা বেড়ে যায়, তাহলে হেপার সালফের লক্ষণ মিলতে পারে। আক্রান্ত স্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল হয় এবং দ্রুত পুঁজ হওয়ার প্রবণতা থাকে। চুলকানির সঙ্গে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া থাকতে পারে। রোগীর স্বভাব অনেক সময় খিটখিটে ও রাগী হয়ে থাকে।Mercurius Solubilis (মার্ক সল)যেসব রোগীর খোসপাঁচড়ার ক্ষত ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, পুঁজ সৃষ্টি হয় এবং বিছানার উষ্ণতায় চুলকানি বৃদ্ধি পায়, তাদের ক্ষেত্রে মার্ক সল বিবেচনা করা হয়। মুখে অতিরিক্ত লালা, মুখের দুর্গন্ধ, প্রচুর ঘাম এবং তৃষ্ণা এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। রোগী একই সঙ্গে গরম ও ঠান্ডা উভয় পরিবেশেই অস্বস্তি অনুভব করতে পারে।Graphites (গ্রাফাইটিস)ত্বক যদি মোটা, শুষ্ক ও ফেটে যাওয়ার প্রবণতাযুক্ত হয় এবং ক্ষতস্থান থেকে মধুর মতো আঠালো স্রাব বের হয়, তবে গ্রাফাইটিসের লক্ষণ পাওয়া যেতে পারে। রোগী সাধারণত শীতকাতুরে হয় এবং শীতকালে সমস্যা বৃদ্ধি পায়। কোষ্ঠকাঠিন্য, পায়ের গোড়ালি ফেটে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী একজিমা জাতীয় সমস্যার সঙ্গে এই ঔষধের মিল পাওয়া যায়।Mezereum (মেজেরিয়াম)মেজেরিয়াম সাধারণত এমন ক্ষেত্রে বিবেচিত হয় যেখানে ফুসকুড়ির ওপর পুরু খোসা জমে এবং খোসার নিচে পুঁজ থাকতে পারে। চুলকানোর পর তীব্র জ্বালা ও ব্যথা অনুভূত হয়। ঠান্ডা বাতাসে উপসর্গ বাড়ে, কিন্তু গরম পরিবেশ বা ঢেকে রাখলে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়। মাথার ত্বকসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে খোসাযুক্ত চর্মরোগে এর লক্ষণ মিলতে পারে।গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা স্ক্যাবিস একটি পরজীবী মাইটজনিত সংক্রামক রোগ। এর মূল চিকিৎসা হলো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত অ্যান্টি-স্ক্যাবিস চিকিৎসা (যেমন পারমেথ্রিন বা অন্যান্য স্বীকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি)। হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচন সাধারণত ব্যক্তির সামগ্রিক লক্ষণের ভিত্তিতে করা হয়। তাই কোনো ঔষধ নিজে নিজে গ্রহণ না করে অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি পরিবারের সকল সদস্যের পরীক্ষা, কাপড়-চোপড় ও বিছানাপত্র পরিষ্কার রাখা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।