উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
ডাঃ গোপাল চন্দ্র দাস, ডি.এইচ.এম.এস (বি.এইচ.এম.ই.সি),ঢাকা ||
জলবসন্ত বা চিকেনপক্স একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা সাধারণত জ্বর, দুর্বলতা ও শরীরে পানিভরা ফুসকুড়ির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। হোমিওপ্যাথিতে রোগের নামের চেয়ে রোগীর সার্বিক শারীরিক ও মানসিক লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে ঔষধ নির্বাচন করা হয়। তাই একই রোগে ভিন্ন রোগীর ক্ষেত্রে ভিন্ন ঔষধ প্রয়োজন হতে পারে। নিচে জলবসন্তে বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হোমিও ঔষধের বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হলো।Antimonium crudum যেসব রোগীর ফুসকুড়ি ঘন, পুঁজযুক্ত বা হলুদাভ আকার ধারণ করে এবং ত্বক মোটা, খসখসে ও জ্বালাযুক্ত হয়ে পড়ে, তাদের ক্ষেত্রে Antimonium crudum গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর চুলকানির সাথে জ্বালা থাকে এবং গরমে বা আগুনের তাপে অস্বস্তি বেড়ে যায়। অতিরিক্ত খাওয়ার পর উপসর্গ বৃদ্ধি পাওয়া এ ঔষধের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। রোগীর জিহ্বায় ঘন সাদা প্রলেপ থাকে এবং বসন্তের সাথে পেটের গণ্ডগোল, অম্বল বা বদহজম দেখা দিলে এটি উপকারী। মানসিকভাবে রোগী খিটখিটে, স্পর্শ অপছন্দকারী এবং একা থাকতে পছন্দ করতে পারে।Pulsatilla চিকেনপক্সে ঘন হলুদ স্রাব বা পুঁজ হওয়ার প্রবণতায় Pulsatilla কার্যকর। রোগী সাধারণত নম্র, কান্নাকাটি করে এবং সঙ্গ বা সহানুভূতি চায়। গরম ঘরে কষ্ট বাড়ে কিন্তু ঠান্ডা বাতাসে আরাম অনুভব করে। তৃষ্ণা না থাকলেও মুখ ও জিহ্বা শুকিয়ে যেতে পারে। ফুসকুড়ির প্রকৃতি পরিবর্তনশীল হয় এবং উপসর্গ এক সময় একরকম, আরেক সময় অন্যরকম হতে পারে। শিশুরা কোলে থাকতে চায় ও সহজেই কেঁদে ফেলে।Sulphur তীব্র চুলকানি, জ্বালাপোড়া ও গরমে উপসর্গ বেড়ে গেলে Sulphur বিবেচিত হয়। রোগী বিশেষ করে রাতে ও বিছানার গরমে বেশি চুলকানি অনুভব করে। পানি লাগলেও চুলকানি বাড়তে পারে। ফুসকুড়ি দীর্ঘদিন শুকাতে না চাওয়া বা বারবার নতুন র্যাশ ওঠা এ ঔষধের লক্ষণ। ত্বক শুষ্ক, নোংরা ও জ্বালাযুক্ত থাকে। মানসিকভাবে রোগী অলস, উদাসীন বা নিজের চিন্তায় ডুবে থাকতে পারে, তবে অনেক সময় দার্শনিক ধরণের চিন্তাও দেখা যায়।Antimonium tartaricum যখন জলবসন্তের সাথে বুকে কফ জমে, শ্বাসকষ্ট বা কাশি দেখা দেয় তখন Antimonium tartaricum উপকারী। রোগী দুর্বল, ঘুমঘুম ও অবসন্ন থাকে। ফুসকুড়ি ঠিকমতো বের না হলে কিংবা দমন হয়ে গেলে এ ঔষধ প্রয়োজন হতে পারে। বুক ভরা কফ থাকলেও রোগী সহজে কফ তুলতে পারে না। শিশুদের ক্ষেত্রে শ্বাস নিতে কষ্ট ও ঝিমুনিভাব বিশেষ লক্ষণ।Belladonna হঠাৎ উচ্চ জ্বর, লাল গরম ত্বক, মাথাব্যথা ও চোখ লাল হয়ে গেলে Belladonna প্রয়োজন হতে পারে। ফুসকুড়ি উজ্জ্বল লাল রঙে দ্রুত বের হয় এবং জ্বর হঠাৎ বেড়ে আবার কমে যেতে পারে। রোগী আলো, শব্দ ও ঝাঁকুনিতে সংবেদনশীল হয়। মানসিকভাবে ভয়, বিভ্রম বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় রোগী কুকুর বা কাল্পনিক বিষয়েও ভয় পায়।Carbo vegetabilis রোগের পরে অতিরিক্ত দুর্বলতা, শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এবং বাতাসের প্রয়োজন অনুভব করলে Carbo vegetabilis কার্যকর। রোগী মুখে বাতাস চায় এবং কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যায়। বসন্তের সাথে গ্যাস, পেট ফাঁপা ও ঢেকুরের প্রবণতা থাকে। রোগের পর দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও অবসাদে এটি উপকারী। মানসিকভাবে রোগী উদাসীন, দুর্বল ও প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে পড়তে পারে।Dulcamara ঠান্ডা ও ভেজা আবহাওয়ার পরে জলবসন্তের উপসর্গ বেড়ে গেলে Dulcamara প্রয়োজন হতে পারে। কখনও ফুসকুড়ি দমন হয়ে অন্য সমস্যা যেমন কাশি, ব্যথা বা ত্বকের জটিলতা দেখা দেয়। ভেজা আবহাওয়ায় রোগীর অস্বস্তি বাড়ে এবং শরীরে ভারী ভাব থাকে।Mercurius পুঁজযুক্ত ফুসকুড়ি, মুখে দুর্গন্ধ, অতিরিক্ত লালা ও রাতে উপসর্গ বৃদ্ধি পাওয়া Mercurius-এর প্রধান লক্ষণ। রোগীর জিহ্বা মোটা, থলথলে এবং দাঁতের দাগযুক্ত হতে পারে। প্রচুর ঘাম হলেও আরাম আসে না। তৃষ্ণা বেশি থাকে এবং মুখে দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব দেখা যায়। মানসিকভাবে রোগী অস্থির, সন্দেহপ্রবণ ও দুর্বল হয়ে পড়ে।Rhus toxicodendron ছোট পানিভরা ফুসকুড়ি, তীব্র চুলকানি ও অস্থিরতায় Rhus toxicodendron বহুল ব্যবহৃত। রোগী স্থির থাকতে পারে না, নড়াচড়ায় বা গরমে কিছুটা আরাম পায়। শরীরে টান ধরা, ব্যথা ও চাপ দিলে আরামবোধ এ ঔষধের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। জিহ্বার ডগা ত্রিভুজাকৃতির লাল হতে পারে। ভেজা ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় কষ্ট বাড়ে। মানসিকভাবে রোগী উদ্বিগ্ন ও অস্থির থাকে।Thuja টিকাদানের পর ভ্যারিসেলা-জাতীয় সমস্যা বা দীর্ঘস্থায়ী ত্বকের জটিলতায় Thuja বিবেচিত হয়। ফুসকুড়ি দীর্ঘদিন শুকাতে না চাইলে বা রোগের পরে ত্বকে দাগ ও খসখসে বৃদ্ধি থাকলে এটি কার্যকর হতে পারে। রোগী শরীর ব্যথা, দুর্বলতা ও অতিসংবেদনশীলতায় ভোগে। মানসিকভাবে লাজুকতা, গোপন ভয় বা নিজের ভেতরে অদ্ভুত অনুভূতি থাকতে পারে।Saracenia purpurea জ্বরের সাথে পানিভরা র্যাশ, জ্বালা-চুলকানি ও ব্যথা থাকলে Saracenia purpurea ব্যবহৃত হয়। রোগী দুর্বল ও ক্লান্ত অনুভব করে এবং র্যাশ ওঠার সময় বমিভাব থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ফুসকুড়ি পরে পুঁজ হওয়ার প্রবণতায় এটি সহায়ক বলে বিবেচিত হয়।Variolinum Variolinum-কে অনেক হোমিও চিকিৎসক বসন্তজাতীয় রোগে গুরুত্বপূর্ণ নোসোড হিসেবে বিবেচনা করেন। ত্বকে ছোট ছোট ঘন ফুসকুড়ি, তীব্র জ্বালা ও চুলকানি থাকলে এটি প্রয়োগ করা হয়। রোগী অস্থির, বিরক্ত ও দুর্বল থাকে, সাথে মাথাব্যথা ও জ্বর থাকতে পারে। র্যাশের পরে দাগ বা পিগমেন্টেশন থেকে যাওয়ার প্রবণতায়ও এটি বিবেচিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে বারবার র্যাশ হওয়া বা জটিল স্কিন সমস্যার ইতিহাস থাকলে এটি প্রয়োজন হতে পারে।সবশেষে মনে রাখতে হবে, হোমিওপ্যাথিতে সঠিক ঔষধ নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে রোগীর ব্যক্তিগত শারীরিক, মানসিক ও সামগ্রিক লক্ষণের উপর নির্ভরশীল। তাই “প্রোপার কেস টেকিং” ছাড়া কেবল রোগের নাম দেখে ঔষধ নির্বাচন সবসময় সঠিক ফল নাও দিতে পারে। গুরুতর জ্বর, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।