উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
ডাঃ গোপাল চন্দ্র দাস, ডি.এইচ.এম.এস (বি.এইচ.এম.ই.সি),ঢাকা ||
ফেলন বা আঙুল হাড়া হলো আঙুলের ডগায়, বিশেষ করে নখের নিচে বা পাশের গভীর টিস্যুতে হওয়া তীব্র প্রদাহ ও পুঁজজনিত সংক্রমণ। এতে আক্রান্ত স্থান ফুলে যায়, তীব্র ধুকপুকানি ব্যথা, জ্বালা, লালভাব এবং পরবর্তীতে পুঁজ সৃষ্টি হতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে অস্থি পর্যন্ত সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে। হোমিওপ্যাথিতে রোগীর শারীরিক, মানসিক ও সামগ্রিক লক্ষণের ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচন করা হয়।Arsenicum Albumআর্সেনিকাম অ্যালবাম রোগীর মধ্যে তীব্র জ্বালা-পোড়া, অস্থিরতা ও দুর্বলতা থাকলে অত্যন্ত কার্যকর। আক্রান্ত আঙুলের ডগা ফুলে যায়, জ্বালাময় ব্যথা হয় এবং রোগী ব্যথায় ছটফট করতে থাকে। রোগী মনে করে তার অবস্থা খুব খারাপ, এমনকি মৃত্যুভয়ও দেখা দিতে পারে। মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন, ভয়গ্রস্ত ও অস্থির থাকে। গরম সেঁক বা উষ্ণতায় আরাম পায় এবং রাতের দিকে কষ্ট বৃদ্ধি পায়। সংক্রমণ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা থাকলে এ ঔষধ গুরুত্বপূর্ণ।Apis Mellificaএপিস মেল তখন উপযোগী যখন আঙুলে হঠাৎ দ্রুত ফোলা শুরু হয় এবং ফোলা ক্রমে বাড়তে থাকে। আক্রান্ত স্থান উজ্জ্বল লাল, টানটান ও চকচকে দেখায়। জ্বালা ও হুল ফোটানোর মতো ব্যথা থাকে। গরমে উপসর্গ বাড়ে এবং ঠান্ডা সেঁকে আরাম লাগে। রোগী সাধারণত পিপাসাহীন এবং গরম সহ্য করতে পারে না। পুঁজের তুলনায় edema বা watery swelling বেশি থাকে। মানসিকভাবে বিরক্তি, কান্নাকাটি বা অস্থিরতা দেখা যেতে পারে।Myristica Sebiferaমাইরিস্টিকা সেবিফেরা ফেলনের অন্যতম প্রধান ঔষধ হিসেবে পরিচিত। একে অনেকেই “Homeopathic Knife” বলেন কারণ এটি দ্রুত পুঁজ তৈরি করে বাইরে বের করতে সাহায্য করে। আঙুলে প্রচণ্ড throbbing pain, প্রদাহ এবং গভীর সংক্রমণে এটি কার্যকর। রোগী ব্যথায় অস্থির হয়ে পড়ে এবং আক্রান্ত স্থানে স্পর্শ সহ্য করতে পারে না। যখন ফোঁড়া পাকার প্রবণতা থাকে বা অস্ত্রোপচার এড়াতে দ্রুত suppuration প্রয়োজন হয় তখন এই ঔষধ বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়।Anthracinumঅ্যানথ্রাসিনাম গুরুতর septic বা বিষাক্ত ধরনের সংক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ। আঙুল শক্ত হয়ে ফুলে যায়, গভীর পুঁজ তৈরি হয় এবং টিস্যু পচনের প্রবণতা দেখা দেয়। আক্রান্ত স্থানে কালচে বা বেগুনি রঙ ধারণ করতে পারে এবং gangrenous পরিবর্তনের আশঙ্কা থাকে। রোগীর তীব্র জ্বালা, ধুকপুকানি ব্যথা ও মারাত্মক স্পর্শকাতরতা থাকে। মানসিকভাবে রোগী অবসন্ন, হতাশ ও বিষণ্ণ হয়ে যেতে পারে। যখন সংক্রমণ দ্রুত খারাপের দিকে যায় তখন এ ঔষধ বিবেচনা করা হয়।Tarentula Hispanicaটারেন্টুলা হিসপানিকা তীব্র অস্থিরতা, জ্বালা ও ছটফটানির ক্ষেত্রে কার্যকর। রোগী স্থির থাকতে পারে না, সবসময় নড়াচড়া করতে চায়। ব্যথার তীব্রতায় রোগীর আচরণ কখনো আক্রমণাত্মক বা উত্তেজিত হয়ে যায়। গান, নাচ বা দ্রুত নড়াচড়ার প্রবণতা দেখা যায়। সন্দেহপ্রবণতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা এবং অতিরিক্ত উত্তেজনা এ ঔষধের মানসিক বৈশিষ্ট্য। ফেলনের সাথে যখন nervous irritation বেশি থাকে তখন এটি উপযোগী।Hepar Sulphuris Calcareumহিপার সালফ পুঁজ হওয়ার আগের তীব্র ব্যথাযুক্ত অবস্থায় খুব কার্যকর। সামান্য স্পর্শও রোগী সহ্য করতে পারে না। ঠান্ডা বাতাসে সমস্যা বাড়ে এবং গরমে আরাম পায়। আক্রান্ত স্থানে সূচ ফোটানোর মতো ব্যথা হয়। পুঁজ হওয়ার পরও জ্বালা ও যন্ত্রণা তীব্র থাকে। রাতের দিকে উপসর্গ বৃদ্ধি পায়। রোগী খিটখিটে মেজাজের ও অতিসংবেদনশীল হতে পারে। আঙুল হাড়ার ক্ষেত্রে এটি বহুল ব্যবহৃত ঔষধ।Siliceaসাইলিসিয়া দীর্ঘস্থায়ী ফেলন, পুরনো পুঁজ বা বের হতে না চাওয়া পুঁজের ক্ষেত্রে কার্যকর। এটি পুঁজকে পরিপক্ব করে সহজে বের হতে সাহায্য করে এবং পরে ক্ষত শুকিয়ে যেতে সহায়তা করে। রোগী সাধারণত ঠান্ডা সহ্য করতে পারে না, দুর্বল ও ঘামপ্রবণ হয়। মানসিকভাবে আত্মবিশ্বাসহীনতা ও ভীরুতা দেখা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে চলা আঙুল হাড়ায় সাইলিসিয়া গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ।Nitric Acidনাইট্রিক অ্যাসিডে আঙুলে ছিদ্র করার মতো তীব্র ব্যথা থাকে। ক্ষতের মুখ অনিয়মিত ও সহজে রক্তপাত হয়। পুঁজযুক্ত ক্ষত ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যায় এবং জ্বালা থাকে। দীর্ঘস্থায়ী, গভীর বা syphilitic tendency-যুক্ত ক্ষতে এটি ব্যবহৃত হয়। রোগী সাধারণত খিটখিটে, সহজে রেগে যায় এবং মানসিকভাবে বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করে।Belladonnaবেলাডোনা ফেলনের একেবারে শুরুর acute inflammatory stage-এ কার্যকর। আক্রান্ত স্থান টকটকে লাল, গরম ও স্পর্শকাতর থাকে। ধুকপুকানি ব্যথা এবং জ্বর থাকতে পারে। রোগীর মুখ লাল হয়ে যায় এবং শরীরে উত্তাপ বাড়ে। মানসিকভাবে উত্তেজনা, ভয় বা বিভ্রান্তি দেখা যেতে পারে। দ্রুত শুরু হওয়া তীব্র প্রদাহে এটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ।Lachesisল্যাকেসিসে আক্রান্ত স্থান বেগুনি বা নীলচে বর্ণ ধারণ করে এবং প্রচণ্ড ব্যথা থাকে। রোগী খুব বাচাল হয় এবং ক্রমাগত কথা বলতে থাকে। ঘুমের আগে ও পরে সমস্যা বাড়ে। যেকোনো স্রাব বা পুঁজ বের হলে রোগের উপশম অনুভূত হয়। আক্রান্ত স্থানে স্পর্শ সহ্য করতে পারে না। মানসিকভাবে ঈর্ষা, সন্দেহপ্রবণতা ও অতিরিক্ত উত্তেজনা থাকতে পারে। septic tendency বা নীলচে প্রদাহে এটি গুরুত্বপূর্ণ।ফেলনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রোগের নাম দেখে নয়, বরং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ, ব্যথার ধরন, গরম-ঠান্ডার প্রভাব, পুঁজের অবস্থা, রোগীর আচরণ ও constitution বিবেচনা করে ঔষধ নির্বাচন করা উচিত। গুরুতর সংক্রমণ, অতিরিক্ত পুঁজ, জ্বর বা অস্থি আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ থাকলে দ্রুত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।