উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
ডাঃ গোপাল চন্দ্র দাস, ডি.এইচ.এম.এস (বি.এইচ.এম.ই.সি),ঢাকা ||
বাত বা রিউম্যাটিক ব্যথা বর্তমানে অত্যন্ত পরিচিত একটি সমস্যা। কারও ক্ষেত্রে এটি জয়েন্টে ব্যথা, কারও ক্ষেত্রে ফুলে যাওয়া, শক্ত হয়ে থাকা কিংবা চলাফেরায় কষ্টের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। আবহাওয়া, শরীরের গঠন, মানসিক অবস্থা, খাবারাভ্যাস এবং পূর্বের রোগ ইতিহাস অনুযায়ী বাতের ধরন ভিন্ন হতে পারে। হোমিওপ্যাথিতে রোগের নামের চেয়ে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই একই ধরনের বাত ব্যথায় ভিন্ন ব্যক্তির জন্য ভিন্ন ঔষধ প্রয়োজন হতে পারে। নিচে বাত ব্যথায় বহুল ব্যবহৃত কিছু গুরুত্বপূর্ণ হোমিও ঔষধের লক্ষণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো। Rhus Toxicodendronবাত ব্যথার অন্যতম প্রধান ঔষধ হলো Rhus Toxicodendron। সাধারণত বিশ্রামে ব্যথা বৃদ্ধি পায় এবং চলাফেরা বা নড়াচড়ার মাধ্যমে ব্যথা কমে আসে। রোগী সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীর শক্ত ও জড়সড় অনুভব করে, কিন্তু কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। ঠান্ডা ও ভেজা আবহাওয়ায় কষ্ট বাড়ে, বিশেষ করে বৃষ্টিতে ভেজার পর ব্যথা তীব্র হয়। গরম সেঁক, গরম আবহাওয়া বা গরম পানিতে আরাম অনুভূত হয়। জয়েন্টে টানটান ব্যথা, মচকানোর মতো অনুভূতি এবং অস্থিরতা এই ঔষধের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। Bryonia Albaযেসব রোগীর সামান্য নড়াচড়াতেই ব্যথা বেড়ে যায় এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামে আরাম লাগে, তাদের ক্ষেত্রে Bryonia Alba গুরুত্বপূর্ণ। রোগী চুপচাপ শুয়ে থাকতে চায়, কারণ নড়লেই ব্যথা বাড়ে। জয়েন্ট ফুলে গরম হয়ে যেতে পারে এবং ব্যথার স্থানে চাপ দিয়ে শুলে কিছুটা আরাম লাগে। এদের সাধারণত তীব্র পিপাসা থাকে—একবারে অনেকখানি পানি পান করে, তবে বারবার নয়। মুখ ও গলা শুকিয়ে যায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা যায়; মল শক্ত ও শুকনো হয়। খিটখিটে মেজাজ এবং একা থাকতে চাওয়াও Bryonia রোগীর বৈশিষ্ট্য। Arnica Montanaআঘাত বা পড়ে যাওয়ার পর বাত ব্যথা শুরু হলে Arnica Montana অত্যন্ত কার্যকর বলে বিবেচিত হয়। রোগী শরীর ভাঙা ভাঙা ব্যথা অনুভব করে, যেন শরীরের সব জায়গায় আঘাত লেগেছে। ব্যথা এত তীব্র হলেও রোগী প্রায়ই বলে “আমি ভালো আছি” এবং চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করে। শরীরে স্পর্শ সহ্য করতে পারে না, কেউ কাছে এলেও ভয় বা বিরক্তি প্রকাশ করে। গরম প্রয়োগে আরাম অনুভব করে এবং শরীর অবসন্ন লাগে। PulsatillaPulsatilla-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো wandering pain বা স্থান পরিবর্তনশীল ব্যথা। কখনো হাঁটু, কখনো কাঁধ, আবার কখনো গোড়ালিতে ব্যথা অনুভূত হয়। গরম ঘরে কষ্ট বাড়ে, কিন্তু খোলা ঠান্ডা বাতাসে আরাম লাগে। সন্ধ্যা বা রাতে ব্যথা বৃদ্ধি পেতে পারে। রোগী সাধারণত নরম স্বভাবের, আবেগপ্রবণ এবং সান্ত্বনা পছন্দ করে। তৃষ্ণা কম থাকে এবং তৈলাক্ত বা ভারী খাবার খাওয়ার পর সমস্যা বাড়ে। মেয়েদের হরমোনজনিত সমস্যার সঙ্গে বাত থাকলেও এই ঔষধ বিবেচনা করা হয়। Ledum Palustreগেঁটে বাত বা বিশেষ করে পায়ের আঙুলের বাতের ক্ষেত্রে Ledum Palustre গুরুত্বপূর্ণ। ব্যথা সাধারণত নিচ থেকে উপরের দিকে ছড়িয়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠান্ডা সেঁক বা ঠান্ডা পানিতে আরাম লাগে, যদিও বেশিরভাগ বাতের ব্যথায় গরমে আরাম হয়। জয়েন্ট ফুলে যেতে পারে এবং স্পর্শে ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। ইউরিক এসিডজনিত গেঁটে বাতের ক্ষেত্রেও এই ঔষধ ব্যবহার করা হয়। Colchicumযখন ইউরিক এসিড বৃদ্ধি পেয়ে গেঁটে বাতের তীব্র আক্রমণ হয়, বিশেষ করে পায়ের বুড়ো আঙুলে অসহনীয় ব্যথা দেখা দেয়, তখন Colchicum গুরুত্বপূর্ণ। ব্যথা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবর্তিত হতে পারে। রোগীর খাবারে অনীহা থাকে এবং খাবারের গন্ধেই বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। সামান্য স্পর্শেও ব্যথা বেড়ে যায় এবং জয়েন্ট অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। Causticumদীর্ঘদিনের পুরনো বাত, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া এবং পেশি দুর্বলতার ক্ষেত্রে Causticum উপকারী। রোগীর রাতে পায়ে খিচ ধরা বা টান ধরা অনুভূত হয়। শুষ্ক ঠান্ডা আবহাওয়ায় সমস্যা বাড়ে, কিন্তু বর্ষাকাল বা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় তুলনামূলক ভালো থাকে। রোগী সাধারণত শীতকাতর, সংবেদনশীল এবং অন্যায়ের প্রতিবাদী স্বভাবের হয়ে থাকে। হাঁটা বা চলাফেরায় জয়েন্টে দুর্বলতা অনুভূত হয়। SulphurSulphur সাধারণত দীর্ঘদিনের বা পুরনো বাতের সমস্যায় ব্যবহৃত হয়। ব্যথার সঙ্গে জ্বালাপোড়া অনুভূতি থাকে এবং গরমে কষ্ট বাড়ে, ঠান্ডায় আরাম লাগে। সকালে শরীর শক্ত লাগে, কিছুক্ষণ চলাফেরা করলে কমে আসে। রোগীর পা জ্বালা করে, বিশেষ করে রাতে বিছানায় থাকাকালীন। হাত-পায়ের তালু এবং মাথার চাঁদিতেও জ্বালাভাব থাকতে পারে। অনেক সময় চর্মরোগ দমন করার পর বাতের সমস্যা শুরু হলে Sulphur প্রয়োজন হয়। রোগী গোসল অপছন্দ করতে পারে এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে কষ্ট বাড়ে। MedorrhinumMedorrhinum-এ ব্যথা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়ায় এবং স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় কষ্ট বাড়ে। রাতে ব্যথা বেশি হয়, তবে দিনেও অস্বস্তি থাকতে পারে। হাঁটু, কাঁধ ও গোড়ালিতে গভীর ব্যথা অনুভূত হয়। রোগী খুব অস্থির থাকে, এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না। উপুড় হয়ে বা হাঁটু মুড়ে ঘুমাতে পছন্দ করে। ঠান্ডা পানীয় ও ঠান্ডা বাতাসের প্রতি আকর্ষণ থাকে এবং কাঁচা ফলমূল বা মিষ্টি খেতে ভালোবাসে। পুরনো গনোরিয়া বা যৌনরোগের ইতিহাস, কিংবা পরিবারে বাতের রোগের ইতিহাস থাকলে এই ঔষধ বিবেচনায় আসে। Kalmia LatifoliaKalmia Latifolia-তে তীব্র ছুরিকাঘাতের মতো shooting pain দেখা যায়। ব্যথা এক জয়েন্ট থেকে অন্য জয়েন্টে স্থানান্তরিত হয় এবং অনেক সময় উপর থেকে নিচের দিকে নেমে আসে। হাঁটু, কাঁধ ও কনুইয়ে স্নায়ু বরাবর টানটান ব্যথা অনুভূত হয়। নড়াচড়ায় কষ্ট বাড়তে পারে এবং ঠান্ডা আবহাওয়ায় সমস্যা বৃদ্ধি পায়। কিছু ক্ষেত্রে বাতের সঙ্গে হৃদযন্ত্রের উপসর্গও থাকতে পারে, যা এই ঔষধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।সবশেষে মনে রাখতে হবে, হোমিওপ্যাথিতে শুধুমাত্র রোগের নাম দেখে ঔষধ নির্বাচন করা হয় না। রোগীর শারীরিক গঠন, মানসিক বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস, আবহাওয়ার প্রভাব, পূর্বের রোগ ইতিহাস এবং সামগ্রিক লক্ষণের ভিত্তিতে “প্রোপার কেস টেকিং” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘদিনের বা তীব্র বাতের সমস্যায় অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।