১১:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

মানিক গঞ্জে জনপ্রিয় হচ্ছে মালচিং পদ্ধতি তে চাষাবাদ

print news -

কৃষি ডেস্ক:  প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। এ কথা সত্য বলে প্রমাণ করছেন মানিকগঞ্জের কৃষকরেরা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল দেখে মানিকগঞ্জে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরা লাভজনক মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছে। এই পদ্ধতি ইতোমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কৃষকদের মাঝে

জানা গেছে, প্রথমে আবাদি জমি প্রস্তুত করে তারপর বীজতলা বা বেড তৈরি করা হয়। একটি বেড তারপর একটি ড্রেন আবার বেড তারপর ড্রেন এভাবেই এ পদ্ধতিতে জমি তৈরি করা হয়। তারপর মালচিং পেপার (এক ধরনের পলিথিন) দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় বেডগুলোকে। এরপর নির্দিষ্ট দূরত্বে মালচিং পেপার ছিদ্র করে বা গোল করে কেটে চারা রোপন করা হয়। এ পদ্ধতিকে মালচিং বা পলি মালচিং পদ্ধতিও বলা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এটাকে পলি মালচিং পদ্ধতি বলে।

ইউটিউব দেখে প্রশিক্ষণ নেয়া জেলার শিবালয় উপজেলার মহাদেবপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের কৃষক মো: জুয়েল হোসেন (এরশাদ) বলেন, ‘আমাদের এলাকায় গত বছর দু’য়েকজন মালচিং পদ্ধতিতে আবাদ করে বেশ সুফল পেয়েছিল। তাই আমি এবার বাংলাদেশ ও ভারতের বেশ কিছু ইউটিউব চ্যানেল দেখে এ পদ্ধতিতে আবাদ করতে উৎসাহিত হই। মূলত আমি এ পদ্ধতিটা ইউটিউব দেখেই শিখেছি। আমি এবার ৮ বিঘা (কারেন্ট মরিচ) হাইব্রিড মরিচ এই পলি মালচিং পদ্ধতিতে আবাদ করেছি।’

তিনি বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে গাছের গোড়ায় পানি শুকিয়ে যায় না এবং গাছের প্রয়োজনীয় পানি সবসময় থাকে। ড্রেনের মধ্য দিয়ে পানি দেয়ার ফলে পাশের বেডের মাটি পানি ধরে রাখে যা অতি রোদ্রেও শুকিয়ে যায় না। যেখানে ৬ বার সেচ দিতে হতো সেখানে এখন দু’বার সেচ দিলেই পুরো সিজন হয়ে যায়। অন্যদিকে, আগে অতি বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে গাছ মরে যেত কিন্তু ড্রেন পদ্ধতি থাকার কারণে পানি জমতে পারে না এবং বেডের উপর গাছ থাকাতে একটানা বৃষ্টি হলেও গাছের কোনো ক্ষতি হয় না। এ পদ্ধতিতে জমিতে আগাছা জন্মাতেও পারে না এবং আগাছা পরিস্কারের জন্যে আমাদের অতিরিক্ত খরচ করতে হয় না। এ দিকে, আগাছা মুক্ত করতে যে বিষ প্রয়োগ করা হয় তা জমি ও উৎপাদিত ফসলের জন্যেও ক্ষতিকর।

তিনি আরো বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে আবাদ করলে মানুষ বিষমুক্ত সবজি ও ফসল পাবে। আমার জমিতে মরিচ গাছ বুড়া হয়ে গেলেই তা তুলে ফেলে এই বেডেই আমি শশা ও করলা বীজ বপন করবো। এভাবে একই বেডে একাধিক ফসল আবাদ করা যায়। তবে এ পদ্ধতিতে বিঘা প্রতি প্রথমেই মালচিং পেপার দেয়াতে বাড়তি খরচ হয় প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। আসলে মোট খরচ যে বেশি তা নয় বিষয়টি হচ্ছে মৌসুমের প্রথমেই খরচটা করতে হয়। প্রথমেই খরচটা করতে হয় বিধায় আমাদের কৃষকদের বেশ বেগ পেতে হয়।’

জুয়েল আরো বলেন, ‘৪ ফুট প্রশস্ত এবং ৪০০ ফুট লম্বা একটা মালচিং পেপার রোলের দাম পাঁচ হাজার টাকা। এমন একটা রোল ১৮ শতাংশ জমিতে দেয়া য়ায়। সরকারিভাবে যদি সত্যিকারে যারা মালচিং পদ্ধতিতে আবাদ করে তাদের ভর্তুকি বা কম সুদে লোন দেয়া হতো তাহলে অনেকেই এই পদ্ধতিতে আবাদে উৎসাহিত হতো। দেশের উৎপাদনও বৃদ্ধি পেত।’

মালচিং পদ্ধতিতে আবাদকারী কৃষক মো: জসিম উদ্দিন ও মো: আওলাদ হোসেন খান বলেন, ‘এখন আমাদের সবচেয়ে যা বেশি প্রয়োজন তা হচ্ছে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া। আমাদের দাবি আমাদের দ্রুত এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেয়া হোক।’

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবু মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘এ পদ্ধতিটা অবশ্যই ভালো এবং আমরা কৃষকদের এ পদ্ধতিতে আবাদে উদ্বুদ্ধ করছি। সিংগাইর এলাকায় আমরা কৃষকদের উন্নত চাষাবাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি এবং সব জায়গাতেই এটা করা হবে।’

কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) ড. মমতাজ সুলতানা বলেন, ‘পলি পেপারের জন্যে এখনো কৃষক পর্যায়ে ভর্তুকির কোনো নির্দেশনা আমাদের নেই। তবে আমরা কৃষকদের সকল প্রকার কারিগরি সহযোগীতা দিতে সদা প্রস্তুত।’

সরেজমিনে শিবালয় উপজেলার মহাদেবপুর, শিমুলিয়া, উলাইল, উথুলিসহ অন্য ইউনিয়নগুলো, হরিরামপুর, সাটুরিয়া উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ, শশা, টমোটো, করলা, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ করতে দেখা যাচ্ছে। এখন গ্রামাঞ্চলে চলতেই চোখে পড়ছে মালচিং পদ্ধতির চাষাবাদ।

কৃষকদের দাবি দ্রুত প্রশিক্ষণ প্রদান, কৃষি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম কমানো, ভর্তুকি প্রদানসহ কৃষি বান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করা হোক।

ট্যাগঃ

মানিক গঞ্জে জনপ্রিয় হচ্ছে মালচিং পদ্ধতি তে চাষাবাদ

প্রকাশিত হয়েছেঃ ০৫:৪৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
print news -

কৃষি ডেস্ক:  প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। এ কথা সত্য বলে প্রমাণ করছেন মানিকগঞ্জের কৃষকরেরা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল দেখে মানিকগঞ্জে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরা লাভজনক মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছে। এই পদ্ধতি ইতোমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কৃষকদের মাঝে

জানা গেছে, প্রথমে আবাদি জমি প্রস্তুত করে তারপর বীজতলা বা বেড তৈরি করা হয়। একটি বেড তারপর একটি ড্রেন আবার বেড তারপর ড্রেন এভাবেই এ পদ্ধতিতে জমি তৈরি করা হয়। তারপর মালচিং পেপার (এক ধরনের পলিথিন) দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় বেডগুলোকে। এরপর নির্দিষ্ট দূরত্বে মালচিং পেপার ছিদ্র করে বা গোল করে কেটে চারা রোপন করা হয়। এ পদ্ধতিকে মালচিং বা পলি মালচিং পদ্ধতিও বলা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এটাকে পলি মালচিং পদ্ধতি বলে।

ইউটিউব দেখে প্রশিক্ষণ নেয়া জেলার শিবালয় উপজেলার মহাদেবপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের কৃষক মো: জুয়েল হোসেন (এরশাদ) বলেন, ‘আমাদের এলাকায় গত বছর দু’য়েকজন মালচিং পদ্ধতিতে আবাদ করে বেশ সুফল পেয়েছিল। তাই আমি এবার বাংলাদেশ ও ভারতের বেশ কিছু ইউটিউব চ্যানেল দেখে এ পদ্ধতিতে আবাদ করতে উৎসাহিত হই। মূলত আমি এ পদ্ধতিটা ইউটিউব দেখেই শিখেছি। আমি এবার ৮ বিঘা (কারেন্ট মরিচ) হাইব্রিড মরিচ এই পলি মালচিং পদ্ধতিতে আবাদ করেছি।’

তিনি বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে গাছের গোড়ায় পানি শুকিয়ে যায় না এবং গাছের প্রয়োজনীয় পানি সবসময় থাকে। ড্রেনের মধ্য দিয়ে পানি দেয়ার ফলে পাশের বেডের মাটি পানি ধরে রাখে যা অতি রোদ্রেও শুকিয়ে যায় না। যেখানে ৬ বার সেচ দিতে হতো সেখানে এখন দু’বার সেচ দিলেই পুরো সিজন হয়ে যায়। অন্যদিকে, আগে অতি বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে গাছ মরে যেত কিন্তু ড্রেন পদ্ধতি থাকার কারণে পানি জমতে পারে না এবং বেডের উপর গাছ থাকাতে একটানা বৃষ্টি হলেও গাছের কোনো ক্ষতি হয় না। এ পদ্ধতিতে জমিতে আগাছা জন্মাতেও পারে না এবং আগাছা পরিস্কারের জন্যে আমাদের অতিরিক্ত খরচ করতে হয় না। এ দিকে, আগাছা মুক্ত করতে যে বিষ প্রয়োগ করা হয় তা জমি ও উৎপাদিত ফসলের জন্যেও ক্ষতিকর।

তিনি আরো বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে আবাদ করলে মানুষ বিষমুক্ত সবজি ও ফসল পাবে। আমার জমিতে মরিচ গাছ বুড়া হয়ে গেলেই তা তুলে ফেলে এই বেডেই আমি শশা ও করলা বীজ বপন করবো। এভাবে একই বেডে একাধিক ফসল আবাদ করা যায়। তবে এ পদ্ধতিতে বিঘা প্রতি প্রথমেই মালচিং পেপার দেয়াতে বাড়তি খরচ হয় প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। আসলে মোট খরচ যে বেশি তা নয় বিষয়টি হচ্ছে মৌসুমের প্রথমেই খরচটা করতে হয়। প্রথমেই খরচটা করতে হয় বিধায় আমাদের কৃষকদের বেশ বেগ পেতে হয়।’

জুয়েল আরো বলেন, ‘৪ ফুট প্রশস্ত এবং ৪০০ ফুট লম্বা একটা মালচিং পেপার রোলের দাম পাঁচ হাজার টাকা। এমন একটা রোল ১৮ শতাংশ জমিতে দেয়া য়ায়। সরকারিভাবে যদি সত্যিকারে যারা মালচিং পদ্ধতিতে আবাদ করে তাদের ভর্তুকি বা কম সুদে লোন দেয়া হতো তাহলে অনেকেই এই পদ্ধতিতে আবাদে উৎসাহিত হতো। দেশের উৎপাদনও বৃদ্ধি পেত।’

মালচিং পদ্ধতিতে আবাদকারী কৃষক মো: জসিম উদ্দিন ও মো: আওলাদ হোসেন খান বলেন, ‘এখন আমাদের সবচেয়ে যা বেশি প্রয়োজন তা হচ্ছে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া। আমাদের দাবি আমাদের দ্রুত এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেয়া হোক।’

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবু মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘এ পদ্ধতিটা অবশ্যই ভালো এবং আমরা কৃষকদের এ পদ্ধতিতে আবাদে উদ্বুদ্ধ করছি। সিংগাইর এলাকায় আমরা কৃষকদের উন্নত চাষাবাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি এবং সব জায়গাতেই এটা করা হবে।’

কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) ড. মমতাজ সুলতানা বলেন, ‘পলি পেপারের জন্যে এখনো কৃষক পর্যায়ে ভর্তুকির কোনো নির্দেশনা আমাদের নেই। তবে আমরা কৃষকদের সকল প্রকার কারিগরি সহযোগীতা দিতে সদা প্রস্তুত।’

সরেজমিনে শিবালয় উপজেলার মহাদেবপুর, শিমুলিয়া, উলাইল, উথুলিসহ অন্য ইউনিয়নগুলো, হরিরামপুর, সাটুরিয়া উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ, শশা, টমোটো, করলা, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ করতে দেখা যাচ্ছে। এখন গ্রামাঞ্চলে চলতেই চোখে পড়ছে মালচিং পদ্ধতির চাষাবাদ।

কৃষকদের দাবি দ্রুত প্রশিক্ষণ প্রদান, কৃষি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম কমানো, ভর্তুকি প্রদানসহ কৃষি বান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করা হোক।