০৮:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিয়ানীবাজার এর সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা

print news -

লেখক: আতাউর রহমান- মাস্টার ট্রেইনার,গবেষক,কলামিস্ট, গ্রন্থ লেখক ও প্রাক্তন সভাপতিঃ বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

বিয়ানীবাজার বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেট। এই সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারা, সুনাই বিধৌত রত্নগর্ভা প্রাচীন এক জনপদ পঞ্চখণ্ড তথা বিয়ানীবাজার উপজেলা। এ জনপদকে মধ্যযুগে ‘ক্ষুদে নবদ্বীপ’ বলে ডাকা হতো। সেই সময় নবদ্বীপ ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের তীর্থভূমি। তখনকার শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কৃতি চর্চা ছিল এ জনপদের গৌরব ও ঐতিহ্যের বিষয়। ইতিহাস বিখ্যাত পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমণি, মহেশ্বর ন্যায়লংকার, শ্রীবাস পণ্ডিত, দার্শনিক জিসি দেব, কবি কৃষ্ণাপ্রিয়া চৌধুরাণী (সিলেটের প্রথম মহিলা কবি), সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, রায় বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেব, মৌলানা আতাহার আলী, মুফতী একরাম আলী প্রমুখ ছিলেন এ মাটির কৃতিমান ব্যক্তিত্ব। সুপাতলাস্থ বাসুদেব মন্দিরের নিকটবর্তী মৃত্তিকা থেকে প্রাপ্ত শিলালিপিখণ্ড ছিল প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রামাণ্য আরেক নিদর্শন। এ লীলাভূমির বুক ভরে আছে বহু সাধক পুরুষ, পণ্ডিত ও মনিষীদের পদরেণু চিহ্ন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই অগ্রসরতা নতুন অভিধায় হিসেবে বিয়ানীবাজারকে চিহ্নিত করে রেখেছে। পনের শতকে মিথিলা গৌরব পক্ষধর মিশ্র ন্যায়শাস্ত্রে যার কাছে পরাজয় বরণ করেছিলেন তাঁর নাম রঘুনাথ শিরোমণি। স্বরস্বতীর এ বরপুত্র বিয়ানীবাজারের সন্তান। রত্নগর্ভা পঞ্চখণ্ডের পরিচয় দিতে গিয়ে পঞ্চদশ শতাব্দীতে পণ্ডিত মহেশ্বর ন্যায়লংকার তাঁর ‘দেশ প্রদীপ’ গ্রন্থে স্বীয় মাতৃভূমির জয়গান গেয়েছেন এভাবেঃ

“যত্র শ্রীবাসুদেবো জলনিধিতনয়া সারদা সর্বদাহত্র।
যত্রাস্ত্রে পঞ্চখণ্ডে সতত বুধসভা পালদত্তৌ ক্ষিতীশৌ।।
বাসস্থানং সুরম্যং ফলমিতি সুরসাং বেষ্ঠিতং ত্বিক্ষুনদ্যা।
তদ্রাজ্যাং স্বর্গতূল্য ত্রিভূবণ বিদিতং তত্র সন্ত্যেব সন্ত:।।”

অর্থাৎ “যে পঞ্চখণ্ডে শ্রীবাসুদেবের লক্ষি ও সরস্বতীসহ সর্বদা বিরাজমান, যেখানে বিজ্ঞ পণ্ডিতদের সতত বুধসভা হয়, যে স্থান পাল ও দত্ত উপাধিধারী ভূ-স্বামীগণ দেশ শাসন করেন, যেখানে বাসস্থানগুলােতে অতিশয় সুরসাল ফল বিদ্যমান এবং যে রাজ্যে ইক্ষুনদী (কুশিয়ারা) দ্বারা বেষ্টিত; সেই পঞ্চখণ্ড রাজ্য স্বর্গতুল্য, ত্রিভূবণে প্রসিদ্ধ এবং তথায় সজ্জনগণ চিরকাল ছিলেন, আছেন এবং থাকবেনই।” পঞ্চদশ শতাব্দীর লেখা এ শ্লোক থেকে তৎকালীন পঞ্চখণ্ড তথা বিয়ানীবাজার এলাকার অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

ইতিহাস যারা লালন করেন, তাঁদের মতে সিলেট থেকে
১৮৭৪ সনে ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’ নামে প্রথম যে সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হয় তা বের হয়েছিল তৎকালীন পঞ্চখণ্ডের সন্তান কবি ও সাংবাদিক প্যারিচরণ দাস এর হাত ধরে। প্যারিচরণ দাসের জন্ম পঞ্চখণ্ডের জলঢুপ থানাধীন শাহবাজপুর এলাকায়। ১৮৭০ সালে প্যারিচরণ দাসের ‘মিএ বিলাপ’ (বন্ধুর মৃত্যুতে) নামক কবিতার বই প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে পদ্য পুস্তক ১ম ও ৩য় ভাগ প্রকাশিত হয়। এই দুটি বই দীর্ঘদিন স্কুলের পাঠ্য পুস্তক হিসেবে পঠিত হয়।

সিলেটের প্রথম মহিলা কবি খ্যাত কৃষ্ণপ্রিয়া চৌধুরাণী ছিলেন বিয়ানীবাজারের জলঢুপ গ্রামের সন্তান। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ’নারী মঙ্গল’ ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত হয়।ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশাের মানিক্য বাহাদুর মোটর দুর্ঘটনায় মারা গেলে তিনি ১৯০৮ সালে ‘শোকস্মৃতি’ নামক একখানি পুস্তিকা রচনা করেন। এ পুস্তিকার মর্মস্পর্শী ভাষায় মুগ্ধ হয়ে রাণীমাতা কবিকে রাজ অতিথির সম্মানে ভূষিত করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯৩০ সালে ‘সংহার পরিহার’ নামে পদ্য ও গদ্যের মিশ্রণে একখানি শ্লোকগাঁথা প্রকাশ করেন। নারী শিক্ষা প্রসারেও কৃষ্ণাপ্রিয়ার ভূমিকা ছিল প্রতিদানযোগ্য।

প্রাক বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তানী শাসনামলের প্রথমদিক পর্যন্ত বিয়ানীবাজারে আরও যেসব ব্যক্তি সাহিত্যব্রতী হিসেবে খ্যাত তাদের কয়েক জনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিম্নে তুলে ধরা গেল:

১. পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমণি : জন্ম খাসা পণ্ডিতপাড়া। গ্রন্থ: চিন্তামণি দীধিতি, প্রামাণ্যবাদ, পদার্থ রত্নমালা, ক্ষণভঙ্গুরবাদ ইত্যাদি।
২. মহেশ্বর ন্যায়লঙ্কার : জন্ম- সুপাতলা। গ্রন্থ: অষ্টবিংশতি প্রদীপ, ভাবার্থ চিন্তামণি ইত্যাদি ।
৩. রামেন্দ্র ভট্টাচার্য্য : জন্ম- লাউতা। গ্রন্থ: মীরাবাঈ, রামপ্রসাদ ইত্যাদি ।
৪. সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য : জন্ম- নয়াগ্রাম। গ্রন্থ: সমাজচিত্রে পঞ্চখণ্ড, আসামে মহাপ্লাবণ, India Under The British Crown.
৫. রামানন্দ মিশ্র : জন্ম- সুপাতলা। গ্রন্থ: রসত বিলাস।
৬. সত্যরাম : জন্ম – সুপাতলা। গ্রন্থ: ঘাটু সঙ্গীত, ধুয় বা ধুরা ।
৭. সতীশচন্দ্র দেব : জন্ম- লাউতা। গ্রন্থ: নীতি সন্দর্ভ সংকলন।

বিভিন্ন তথ্যপুঞ্জি অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, বহু সাধক, পণ্ডিত ও মনিষীদের কর্ম পদচারণা ছিল বিয়ানীবাজার উপজেলায়। লাউতার প্রতীথযশা সাংবাদিক সতীশ চন্দ্র দেব ছিলেন ”জন্মভূমি ও ‘শ্রীভূমি’ নামক দু’টি পত্রিকার সম্পাদক। ১৯২০ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত হতো জন্মভূমি পত্রিকা। এটি সে সময় জাতীয়তাবাদী সাপ্তাহিকী হিসেবে পরিচিত ছিল। আর ১৯২৬ সালে করিমগঞ্জ থেকে তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো ‘শ্রীভূমি’ পত্রিকা। সতীশ চন্দ্র দেব তাঁরই পিতার প্রতিষ্ঠিত ‘জনশক্তি’, ‘শ্রীভূমি’ এবং সুরমা পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভাগে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন। আরেক স্বনামধন্য সাংবাদিক ও কলামিস্ট ক্ষিরোদচন্দ্র দেব তৎকালিন সুরমা, জনশক্তি ও শ্রীভূমি পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন। বিয়ানীবাজার পৌরসভার পণ্ডিতপাড়ার তুষারপণ্ডিত ছিলেন ভারতের একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক। তিনি সেখান থেকে বিবিসি’র কলকাতা প্রতিনিধির দায়িত্বও পালন করতেন। বিয়ানীবাজারের কাকুরা গ্রামের কৃতি সন্তান রাধানাথ চৌধুরী ছিলেন ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ‘পরিদর্শক’ পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক।

বাঙালির গৌরবময় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েও বিয়ানীবাজারের কলম সৈনিকরা পিছ পা ছিল না। সেই সময় মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত হয় বেশ ক’টি পত্রিকা। ভাষা সৈনিক ও সাংবাদিক এইচ.সাদত খান ও আকাদ্দস সিরাজুল ইসলামের যৌথ উদ্যোগে আসামের করিমগঞ্জ শহর থেকে প্রকাশিত হতো ‘সাপ্তাহিক মুক্তবাংলা’ নামক পত্রিকা। এ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম এবং সা’আদত খান ছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি। পত্রিকায় তাঁর ছদ্মনাম ছিল আবুল হাসনাত(এ.এইচ)। এ.এইচ. সা’আদত খান ছিলেন ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। তিনি ১৯৫৩ সনে প্রকাশিত নওবেলাল পত্রিকার ঢাকার দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৫৭ সনে তিনি ‘দেশের ডাক’ নামে সিলেট থেকে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। ১৯৫৭-৬৮ ইংরেজী পর্যন্ত দৈনিক অবজারভার ও দৈনিক সংবাদ পত্রিকায়ও সা’দত কগান সিলেট প্রতিনিধির দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন।
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ছােটদেশ গ্রামের সাংবাদিক মােহাম্মদ আব্দুল বাসিত এর সঞ্চালনায় ভারতের করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক জয়বাংলা’। তিনি পত্রিকার সহকারি সম্পাদক ও ‘সােনার বাংলা’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও আলীনগরের আব্দুল মতিন চৌধুরী সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ’ এবং দেউল গ্রামের মােস্তফা আল্লামা সম্পাদিত ‘জন্মভূমি’ পত্রিকা বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতার ইতিহাসকে সমৃদ্ধি দিয়েছে।

বিয়ানীবাজারের মাথিউরার নিভৃত পল্লীর শব্দ সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম। তাঁর সাংবাদিকতা শুরু দৈনিক আজাদ পত্রিকার মধ্য দিয়ে। তিনি দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালিন সময় আসামের করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত “মুক্ত বাংলা” সাপ্তাহিক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। তিনি ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ, পয়গাম, পূর্বদেশ, মাহে নও, মাসিক মােহাম্মদী, সওগাত ও আল-ইসলাহ পত্রিকা ও সাময়িকীতে লেখালেখি করতেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থঃ নয়া দুনিয়া, সাবুর দুনিয়া, যুগল, রাক্ষুসে বন্যা এবং নীরব নদী, পঞ্চাবিংশতি ও চালচিত্র, মাটির চেরাগ, সােনার বাংলা, বন্দী জীবনের কিছু কথা, কারাগার থেকে বেরিয়ে। তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে ‘আকাদ্দস সিরাজ ইসলাম রচনাবলী”।

কসবা গ্রামের কৃতি সন্তান আব্দুল হাকিম তাপাদার একজন শক্তিধর লেখক ও সাংবাদিক। তিনি সাপ্তাহিক যুগভেরী, আল ইসলাহ, দৈনিক জালালাবাদ ও দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় কাজ করেছেন। সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকায় ‘যষ্টিমধু’ কলাম লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। প্রবীণ সাংবাদিক সিলেট প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি বোরহান উদ্দিন খান “হিং টিং ছট” শিরোনামে লিখনি দিয়ে একজন নিয়মিত কলাম লিখক হিসেবে সংবাদপত্র জগতে নিজ আসন প্রতিষ্ঠা করেন। শালেশ্বর গ্রামের বাহাউদ্দিন ছিলেন একজন স্বনামধন্য প্রবীণ সাংবাদিক। তিনি যথাক্রমে দৈনিক সিলেট বাণীর প্রধান সম্পাদক ও ইংরেজী দৈনিক মর্ণিং সান পত্রিকায় দীর্ঘদিন বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

সিলেটী ভাবুকদের রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ-শব্দ দর্শনে কিংবা সৃষ্টিকর্মে সাংবাদিক মােহাম্মদ আব্দুল বাসিত একটি উজ্জ্বল নাম। রম্য রচনা, ব্যঙ্গ লিখায় তিনি যেমনি ছিলেন পারদর্শী তেমনি সংবাদপত্রের কলামিস্ট হিসেবেও ছিলেন পাঠক নন্দিত। বাউল প্রকৃতির ও বিদ্রোহী স্বভাবের আব্দুল বাসিত যাটের দশকে পূর্ব বাংলার মফস্বল এলাকায় ইত্তেফাক সাংবাদিক হিসেবে সাংবাদিকতায় পা রাখেন। টানা তিন দশকের সাংবাদিকতায় তিনি ঢাকা, সিলেট, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেছেন নানা সংবাদপত্রে। ছাত্রাবস্থায় তাঁর শারীরবৃত্তে দেখা দেয় বিশৃঙ্খল দংশন। তাই তিনি বধির সাংবাদিক হিসেবে সর্বমহলেই ছিলেন পরিচিত। বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব-এর সম্পাদনায় ও প্রকাশনায় ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে মােহাম্মদ আব্দুল বসিত-এর সিলেট বিষয়ক কিছু মৌলিক রচনা নিয়ে “মােহাম্মদ আব্দুল বাসিত রচনাবলীঃ সহস্র বিস্মৃতিরাশি”‘ নামে একটি পুস্তিকা বের হয়।

বিয়ানীবাজারে বাহিরে অবস্থান করেও সিলেট থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত “দৈনিক আজকের সিলেট” এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি লোকমান আহমদ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত “সাপ্তাহিক প্রহর” সম্পাদক এম.এ.তারিক (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি) সাংবাদিকতার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়াও লাউতা গ্রামের ডা: নিবেদিতা দাস পুরকায়স্থ ছিলেন একজন লেখক ও সাংবাদিক। তার ছােট বোন রাখি দাস পুরকায়স্থ (ন্যাপনেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য’র স্ত্রী) দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় ‘নন্দিনী মালিয়া’ ছদ্মনামে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তাদের সম্পাদনায় ‘চিহ্ন’ নামের একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হতো।

পরবর্তীতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা পেশায় যারা নিয়োজিত থেকে বিয়ানীবাজারকে গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন তাদের মধ্যে দৈনিক যুগভেরী পত্রিকার কবি শামসাদ হুসাম, দৈনিক সংবাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান শহীদুল ইসলাম, প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকার সাবেক স্টাফ রিপাের্টার ও প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার চিফ রিপোর্টার আজিজুল পারভেজ, বর্তমানে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর রেজওয়ান আহমদ (দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি), দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার স্টাফ রিপাের্টার শাহজাহান কমর প্রমুখের কর্মনাম উল্লেখযোগ্য।

আশির দশকের প্রথমদিকে সাংবাদিকতায় আসেন আব্দুল হাছিব, আব্দুর রউফ খান মিষ্ঠু, মিসবাহ উদ্দিন, রণজিৎ চক্রবর্তী, হেলাল উদ্দিন, আব্দুর রহীম, আব্দুল আজিজ, আলী ঈসমাইল, দেলোয়ার হোসেন জিলন, কবি ফজলুল হক, শাকুর মজিদ, খালেদ জাফরী(পরবর্তীতে প্রেসক্লাব সভাপতি) প্রমুখ।

এদিকে খালেদ জাফরী’ ও ফারুক যোশী’র সম্পাদনায় “বিয়ানীবাজার পরিক্রমা-১ (প্রামাণ্য গ্রন্থ) ও খালেদ জাফরী”র সম্পাদনায় প্রকাশিত “বিয়ানীবাজার পরিক্রমা-২ বিয়ানীবাজারের উৎস অনুসন্ধানের এক মাইলফলক। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘বাঙালি’ ও ‘ঠিকানা’ পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন সাংবাদিক আব্দুর রউফ খান মিষ্ঠু, মো. মিসবাহ উদ্দিন ও নাজমুল ইসলাম হেলাল। আব্দুর রউফ খান মিষ্ঠু বাংলাদেশ ফিরে বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০১১ পর্যন্ত আমৃত্যু এ দায়িত্ব পালন করেন। তবে যারা এ পেশায় ছিলেন, সময়ের ব্যবধানে অধিকাংশই আর এ পেশায় এখন নেই।

কলামিস্ট আতাউর রহমান এর লেখালেখি শুরু ১৯৮৩ সনে। তিনি কাজ করেন ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক প্রতিশ্রুতি, দৈনিক রূপালী, বাংলাবাজার পত্রিকা, দৈনিক মানবজমিন, সাপ্তাহিক যুগভেরী, দৈনিক আজকের সিলেট, দৈনিক জালালাবাদ সহ স্থানীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায়। ২০০৫ সন থেকে ২০১১ পর্যন্ত তিনি একাধারে বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১২ সনে প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ২০২০ পর্যন্ত দায়িত্বরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিয়ানীবাজার উপজেলার দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্বরত। ২০২৩ সনে তিনি বিয়ানীবাজার উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থঃ পঞ্চখণ্ডের পথ ও পথিকৃৎ (তথ্যগ্রন্থ), একুশ থেকে স্বাধীনতা, সৃজনী ও অনির্বাণ একুশ(সম্পাদিত), বিয়ানীবাজার সংলাপ (তথ্য গ্রন্থ), জাগরণ(তথ্যগ্রন্থ), আফতার আলী হেডমাস্টার সম্মাননা গ্রন্থ (সম্পাদিত) ও মাধ্যমিক স্তরে পঠিত Learners’ Basic English Grammar & Composition এবং Basic Grammar For High School Learners’ নামক দুটি ইংলিশ গ্রামার বই।

আশির দশকের শেষের দিকে বিয়ানীবাজারের সাংবাদিক অঙ্গনে যেন এক নতুন সূর্যোদয় ঘটে। এ সময় সাংবাদিকতা অঙ্গনকে যারা সমৃদ্ধি দিয়েছেন তারা হলেন কলামিস্ট ফারুক যোশী, কলামিস্ট আতাউর রহমান, ইত্তেফাক প্রতিনিধি বাবুল হোসেন, শাহজাহান কমর, জয়নাল আফসার, আজিজুল পারভেজ, আব্দুল কাদির মুরাদ, আলী আহমেদ বেবুল, আজহারুল ইসলাম, মাসুদ আহমদ চৌধুরী, হীরণ রোহী দাস, আনােয়ার হোসেন, আব্দুলাহ আল আনসারী প্রমুখ। কিন্তু জীবন জীবিকা ও বিদেশমুখীতার খপ্পরে পড়ে তাদের অনেকেই আজ আর সাংবাদিকতা পেশায় নেই। ফলে ক্রম প্রসারিত ধারায় আশানুরূপ উন্নতি আর ঘটেনি। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সকল রতি মহারতি নিজেদের স্বার্থে সময় সময় বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকদের ব্যবহার করেছেন। দেশের মফস্বল এলাকার প্রথম প্রতিষ্ঠিত বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব নামের প্রতিষ্ঠান দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে আশ্বাসের বাণী ছাড়া কিছুই পায়নি। আজও প্রেসক্লাবটি তার নিজস্ব কোন ঠিকানা খুঁজে পায়নি। ফলে বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক ক্লাবের পরিত্যক্ত ঘরটি সংস্কার করে অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছে।

সংবাদপত্র হচ্ছে- ৪র্থ রাষ্ট্র’। সংবাদপত্রে রাষ্ট্র সরকার-জনগণের আবহমান কালের প্রবহমান ইতিহাস, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ঘটনার চলন্তিকাই সংবাদপত্রে প্রকাশ পায়। সংবাদপত্রে যারা কাজ করেন তাদেরকেই বলা হয় সাংবাদিক। সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। সাংবাদিকরা হচ্ছে সত্যের বাহক ও যুগের দূত। সাংবাদিকরা মুক্তচিন্তা ও বিবেক শাসিত হয়ে সত্যেকে খুঁজেন। তাঁদের শব্দের গাঁথুনিতে সজ্জিত হয় সংবাদপত্র নামক শিল্প। এমন একটি মহৎ পেশা প্রসঙ্গে বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতার তালিকা টানতে গিয়ে দু’টানায় পড়তে হয়। কারণ নিবেদিত সাংবাদিকদের পাশাপাশি এমনও সাংবাদকর্মী আছেন যারা পত্রপত্রিকায় দু’একটি ফিচার কিংবা টুকটাক দু’চার লাইনের নিউজ লিখে কিংবা ফেসবুকে কপিপেস্ট করে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে থাকেন। আর স্থানীয় কোন নির্বাচন এলে সাংবাদিকদের প্লে-কার্ডে সামাজিক মাধ্যম সয়লাব হতে দেখা যায়। এসবের মাঝে প্রকৃত সাংবাদিক যাচাই-বাছাই করা নি:সন্দেহে একটি দূরূহ কাজ। এরকম অবস্থায় এ নিবন্ধের বস্তুনিষ্ঠতা বা যথার্থতা কতটুকু সাফল্যের আলো দেখবে তা বলা মুশকিল। এ বিচারের দায়িত্ব পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।

মানুষের চোখ সবই দেখে; কিন্তু চোখের ভেতরে যখন ক্ষুদ্র পোকা প্রবেশ করে তখন ভেতরের থাকা পোকাটি চোখ আর দেখতে পায় না। এ নিবন্ধ লিখতে গিয়ে আমার অবস্থাও তাই। এক্ষেত্রে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি কামনা ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। এ নিবন্ধটি যেহেতু বিয়ানীবাজারের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে। তাই সঙ্গত কারণে সাহিত্যাঙ্গনের পূর্ণাঙ্গ আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। ভিন্ন কোন প্রবন্ধে সাহিত্যাঙ্গন নিয়ে হয়তো আলোচনা করা যাবে।

যা হোক, বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতা অঙ্গনে নব্বইর দশকে যারা যোগ দিয়েছিলেন সেই কলম সৈনিকরা হলেন- কামরুল আম্বিয়া, রেজওয়ান আহমদ, আব্দুল খালিক, এম হাসানুল হক উজ্জ্বল, আব্দুর রহিম শামীম, এম আনােয়ারুল ইসলাম অভি, এম সাত্তার আজাদ, শরীফুল হক মঞ্জু, সজিব ভট্টাচার্য, রাজু ওয়াহিদ, এম.এ.মুকিত, খছরুল ইসলাম, আব্দুল ওয়াদুদ, এনায়েত হোসেন সােহেল, মিলাদ মাে. জয়নুল ইসলাম (বর্তমান প্রেসক্লাব সম্পাদক), ছাদেক আহমদ আজাদ, মাছুম আহমদ, মো. জাকির হোসেন, মো. জহির উদ্দিন প্রভাষক, শাহীন আলম হৃদয়, লুৎফুর রহমান, হাসান শাহরিয়ার, ফয়সল মাহমুদ, দেলোয়ার হোসেন, শাবুল আহমদ, আহমদ ফয়সাল, ফুজেল আহমদ, শামছুর রহমান সুমেল, পলাশ আফজাল, মনােয়ার হোসেন লিটন, সুয়াইবুর রহমান স্বপন, শিপার আহমদ পলাশ, সুফিয়ান আহমদ ও সুজন আহমদ-সহ নাম না জানা অনেকেই। তাদের অনেকেই ভিন্ন পেশায় গমন ও প্রবাসের জীবন বেঁচে নেয়ায় এ পেশা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন।

পত্রিকার চাহিদা বেড়েছে। সাংবাদিকদের সংখ্যাও বেড়েছে। সমগ্র দেশের ন্যায় বিয়ানীবাজারের মফস্বল থেকেও পত্রিকা বের হয়। প্রথমদিকে নিয়মিত বের হলেও এখন আর কাগজের গন্ধ মিলে না। এ পর্যন্ত বিয়ানীবাজারে সাংবাদিক এনায়েত হোসেন সােহেল কতৃক বিলুপ্ত সাপ্তাহিক পঞ্চখণ্ড দর্পণ, মিলাদ মাে. জয়নুল ইসলাম কতৃক সাপ্তাহিক দিবালোক(পরবর্তীতে হাসান শাহরিয়ার) বের হলেও প্রকাশকদের স্বকীয়তার কারণে পত্রিকাটির তৎপরতা এখন চোখে পড়ে না। দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিক ছাদেক আহমদ আজাদ কতৃক সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক বিয়ানীবাজার বার্তা’ পত্রিকাটিও এখন অনিয়মিত। বিয়ানীবাজারের সংবাদশিল্পে ছাদেক আজাদের পত্রিকা প্রকাশনার উদ্যোগ ছিল প্রতিদানযোগ্য। আর মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম এর সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক আগামী প্রজন্ম’ প্রচারে শীর্ষে থাকলেও এখন নিয়মিত প্রকাশনার চেয়ে অনলাইন ভার্সনে পত্রিকা চলছে। একই ধারা অনুসরণ করে চলেছে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আব্দুল বাসিত টিপু সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক নবদ্বীপ’, সাংবাদিক মাসুম আহমদ সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক সম্ভাবনা’ পত্রিকা। এখানে ঐতিহাসিক কারণে আরেকটা নাম উচ্চারণ না করলে অন্যায় হবে। তিনি হলেন, বিয়ানীবাজারের নিউজপেপার এজেন্সীর প্রোপাইটার মরহুম ফরিদ উদ্দিন আহমদ। মূলতঃ তিনিই বিয়ানীবাজারের সংবাদপত্র ব্যবসার দিকপাল ছিলেন। যার উৎসাহ উদ্দীপনায় বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতা অঙ্গনে জাগরণ এসেছিল।

আশির দশকে বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব’র উন্মেষ হলেও বিভিন্ন আঞ্চলিকতাবাদ, সাংগঠনিক ঘাত-প্রতিঘাত ও সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানটির শঙ্কা ও গতিধারা আগেও তেমন কুসুমাত্তীর্ণ ছিল না। ২০২১ সনে এসেও সেই টানাহেঁচড়া অব্যাহত আছে। স্বকীয়তা ও ঐক্যের স্বার্থে এ ধারা কোনভাবেই শুভকর্ম বহন করে না। ঐক্যের ছাতার নিচে পদ-পদবী সব সময় সম্মানের। আসন ধরে রাখতে হয় ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতা দিয়ে। বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব এর বর্তমান নেতৃবৃন্দকে স্বীয়কর্ম দিয়ে ঐক্যের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। সংবিধান ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। তবে প্রকৃত সাংবাদিকরা যেন প্রেসক্লাবের বাহিরে না থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখা উচিত। ভুলে গেলে চলবে না যে, অট্টালিকার প্রাচুর্যের চেয়ে ঐক্যের কুঁড়েঘরই সকলের জন্য সম্মানের ও গর্বের।

সেই ধারাবাহিকতায় এসে হালআমলে বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতায় ২০২১খ্রি. অবদি আরও যারা যুক্ত হয়েছেন, তারা হলেন- আবু তাহের রাজু (বাংলা টিভি), সামিয়ান হাসান (আমাদের সময়), তোফায়েল আহমদ (জালালাবাদ), এম. এ. ওমর (নতুন দিন), সৈয়দ মুনজের হোসেন বাবু (ম্যাপ টিভি), জসিম উদ্দিন (আমার সংবাদ), সাহেদ আহমদ, এহসান করিম খোকন(জনতার টিভি), আবুল হাসান (দিবালোক), তাজবীর আহমদ ছাইম (যায়যায়দিন), মিছবাহ উদ্দিন (শুভ প্রতিদিন), সাইদুল ইসলাম (৭১ বাংলা), শহিদুল ইসলাম সাজু (একাত্তর), আহমদ রেজা (বিয়ানীবাজার নিউজ২৪.কম), ইমাম হাসনাত সাজু (দিবালোক), আহমদ এহসানুল কাদির (বিয়ানীবাজার টিভি), আমিনুল হক দিলু (আজকের সিলেট) প্রমুখ।

শেষ কথা, দেশ জাতি ও জনমত গঠনে সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিহার্য। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে গিয়ে কেউ কেউ শারিরিকভাবে হন নিগৃহীত। কেউ কেউ স্বার্থান্বেষী মহলের আক্রমণের শিকার হন। কারো কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক হামলা-মামলার ঘটনাও ঘটে। কারো চাকুরির উপর নেমে আসে ঘাত-প্রতিঘাত। এভাবে নানা ছলছাতুরির কুটকৌশলে হয়রানির শিকার হন মফস্বল সাংবাদিকরা। এ মহৎ পেশায় বিভাজন কাম্য হতে পারে না। কে ছোট সাংবাদিক, আর কে বড় সাংবাদিক, তা না ভেবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঐক্য ও বস্তুনিষ্ঠতা। নচেৎ ঘুণেধরা এ সমাজ ব্যবস্থায় যাহা কিছু অশুভ, অকল্যাণকার তা প্রগতির স্বাভাবিক গতিধারাকে ব্যাহত করবেই।
মনে রাখবেন, সাংবাদিকদের ক্ষেত্র হচ্ছে সংবাদপত্র। যেখানে মেধা ও মনন বিকাশের চর্চা হয়, সেখানকার সৌকার্য্য বিনাশ করা কলম সৈনিকের কাজ নয়। পত্র-পত্রিকা তদারকি যিনি করেন তিনি সম্পাদক। সম্পাদককে অবতীর্ণ হতে হয় বিচারকের ভূমিকায়। কিন্তু বিচারক যদি আইন-কানুন বিষয়ে অযোগ্য হন, ব্যক্তি জীবনে অসৎ হন; তাহলে বিচারপ্রার্থী মানুষ যেমনি ন্যায়-বিচার পায় না, তেমনি সম্পাদক অযোগ্য হলে পত্রিকার লেখার মান অনুধাবন সহজতর হয় না।
সাংবাদিকগণ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন না, কিংবা কারো দালালির জন্য লিখেন না। কাউকে ফুল দিয়ে তোষামোদি করেন না। তিনি কলম দিয়ে সমাজকে জাগ্রত করে তুলেন। তার বত্যয় হলে সবচেয়ে বেশী যিনি ক্ষতিগ্রস্থ হন, তিনি হলেন সাংবাদিক। তাই, পাঠক বিভ্রান্ত হওয়ার মতো কোন কর্মই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কাম্য হতে পারে না।

লেখক_পরিচিতি:
Π মাস্টার ট্রেইনার,গবেষক,কলামিস্ট, গ্রন্থ লেখক ও প্রাক্তন সভাপতিঃ বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

ট্যাগঃ
জনপ্রিয় সংবাদ

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ৩৬ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

বিয়ানীবাজার এর সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা

প্রকাশিত হয়েছেঃ ০৩:১৮:২৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জুন ২০২৩
print news -

লেখক: আতাউর রহমান- মাস্টার ট্রেইনার,গবেষক,কলামিস্ট, গ্রন্থ লেখক ও প্রাক্তন সভাপতিঃ বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।

বিয়ানীবাজার বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেট। এই সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারা, সুনাই বিধৌত রত্নগর্ভা প্রাচীন এক জনপদ পঞ্চখণ্ড তথা বিয়ানীবাজার উপজেলা। এ জনপদকে মধ্যযুগে ‘ক্ষুদে নবদ্বীপ’ বলে ডাকা হতো। সেই সময় নবদ্বীপ ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের তীর্থভূমি। তখনকার শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কৃতি চর্চা ছিল এ জনপদের গৌরব ও ঐতিহ্যের বিষয়। ইতিহাস বিখ্যাত পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমণি, মহেশ্বর ন্যায়লংকার, শ্রীবাস পণ্ডিত, দার্শনিক জিসি দেব, কবি কৃষ্ণাপ্রিয়া চৌধুরাণী (সিলেটের প্রথম মহিলা কবি), সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, রায় বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেব, মৌলানা আতাহার আলী, মুফতী একরাম আলী প্রমুখ ছিলেন এ মাটির কৃতিমান ব্যক্তিত্ব। সুপাতলাস্থ বাসুদেব মন্দিরের নিকটবর্তী মৃত্তিকা থেকে প্রাপ্ত শিলালিপিখণ্ড ছিল প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রামাণ্য আরেক নিদর্শন। এ লীলাভূমির বুক ভরে আছে বহু সাধক পুরুষ, পণ্ডিত ও মনিষীদের পদরেণু চিহ্ন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই অগ্রসরতা নতুন অভিধায় হিসেবে বিয়ানীবাজারকে চিহ্নিত করে রেখেছে। পনের শতকে মিথিলা গৌরব পক্ষধর মিশ্র ন্যায়শাস্ত্রে যার কাছে পরাজয় বরণ করেছিলেন তাঁর নাম রঘুনাথ শিরোমণি। স্বরস্বতীর এ বরপুত্র বিয়ানীবাজারের সন্তান। রত্নগর্ভা পঞ্চখণ্ডের পরিচয় দিতে গিয়ে পঞ্চদশ শতাব্দীতে পণ্ডিত মহেশ্বর ন্যায়লংকার তাঁর ‘দেশ প্রদীপ’ গ্রন্থে স্বীয় মাতৃভূমির জয়গান গেয়েছেন এভাবেঃ

“যত্র শ্রীবাসুদেবো জলনিধিতনয়া সারদা সর্বদাহত্র।
যত্রাস্ত্রে পঞ্চখণ্ডে সতত বুধসভা পালদত্তৌ ক্ষিতীশৌ।।
বাসস্থানং সুরম্যং ফলমিতি সুরসাং বেষ্ঠিতং ত্বিক্ষুনদ্যা।
তদ্রাজ্যাং স্বর্গতূল্য ত্রিভূবণ বিদিতং তত্র সন্ত্যেব সন্ত:।।”

অর্থাৎ “যে পঞ্চখণ্ডে শ্রীবাসুদেবের লক্ষি ও সরস্বতীসহ সর্বদা বিরাজমান, যেখানে বিজ্ঞ পণ্ডিতদের সতত বুধসভা হয়, যে স্থান পাল ও দত্ত উপাধিধারী ভূ-স্বামীগণ দেশ শাসন করেন, যেখানে বাসস্থানগুলােতে অতিশয় সুরসাল ফল বিদ্যমান এবং যে রাজ্যে ইক্ষুনদী (কুশিয়ারা) দ্বারা বেষ্টিত; সেই পঞ্চখণ্ড রাজ্য স্বর্গতুল্য, ত্রিভূবণে প্রসিদ্ধ এবং তথায় সজ্জনগণ চিরকাল ছিলেন, আছেন এবং থাকবেনই।” পঞ্চদশ শতাব্দীর লেখা এ শ্লোক থেকে তৎকালীন পঞ্চখণ্ড তথা বিয়ানীবাজার এলাকার অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

ইতিহাস যারা লালন করেন, তাঁদের মতে সিলেট থেকে
১৮৭৪ সনে ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’ নামে প্রথম যে সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হয় তা বের হয়েছিল তৎকালীন পঞ্চখণ্ডের সন্তান কবি ও সাংবাদিক প্যারিচরণ দাস এর হাত ধরে। প্যারিচরণ দাসের জন্ম পঞ্চখণ্ডের জলঢুপ থানাধীন শাহবাজপুর এলাকায়। ১৮৭০ সালে প্যারিচরণ দাসের ‘মিএ বিলাপ’ (বন্ধুর মৃত্যুতে) নামক কবিতার বই প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে পদ্য পুস্তক ১ম ও ৩য় ভাগ প্রকাশিত হয়। এই দুটি বই দীর্ঘদিন স্কুলের পাঠ্য পুস্তক হিসেবে পঠিত হয়।

সিলেটের প্রথম মহিলা কবি খ্যাত কৃষ্ণপ্রিয়া চৌধুরাণী ছিলেন বিয়ানীবাজারের জলঢুপ গ্রামের সন্তান। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ’নারী মঙ্গল’ ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত হয়।ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশাের মানিক্য বাহাদুর মোটর দুর্ঘটনায় মারা গেলে তিনি ১৯০৮ সালে ‘শোকস্মৃতি’ নামক একখানি পুস্তিকা রচনা করেন। এ পুস্তিকার মর্মস্পর্শী ভাষায় মুগ্ধ হয়ে রাণীমাতা কবিকে রাজ অতিথির সম্মানে ভূষিত করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯৩০ সালে ‘সংহার পরিহার’ নামে পদ্য ও গদ্যের মিশ্রণে একখানি শ্লোকগাঁথা প্রকাশ করেন। নারী শিক্ষা প্রসারেও কৃষ্ণাপ্রিয়ার ভূমিকা ছিল প্রতিদানযোগ্য।

প্রাক বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তানী শাসনামলের প্রথমদিক পর্যন্ত বিয়ানীবাজারে আরও যেসব ব্যক্তি সাহিত্যব্রতী হিসেবে খ্যাত তাদের কয়েক জনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিম্নে তুলে ধরা গেল:

১. পণ্ডিত রঘুনাথ শিরোমণি : জন্ম খাসা পণ্ডিতপাড়া। গ্রন্থ: চিন্তামণি দীধিতি, প্রামাণ্যবাদ, পদার্থ রত্নমালা, ক্ষণভঙ্গুরবাদ ইত্যাদি।
২. মহেশ্বর ন্যায়লঙ্কার : জন্ম- সুপাতলা। গ্রন্থ: অষ্টবিংশতি প্রদীপ, ভাবার্থ চিন্তামণি ইত্যাদি ।
৩. রামেন্দ্র ভট্টাচার্য্য : জন্ম- লাউতা। গ্রন্থ: মীরাবাঈ, রামপ্রসাদ ইত্যাদি ।
৪. সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য : জন্ম- নয়াগ্রাম। গ্রন্থ: সমাজচিত্রে পঞ্চখণ্ড, আসামে মহাপ্লাবণ, India Under The British Crown.
৫. রামানন্দ মিশ্র : জন্ম- সুপাতলা। গ্রন্থ: রসত বিলাস।
৬. সত্যরাম : জন্ম – সুপাতলা। গ্রন্থ: ঘাটু সঙ্গীত, ধুয় বা ধুরা ।
৭. সতীশচন্দ্র দেব : জন্ম- লাউতা। গ্রন্থ: নীতি সন্দর্ভ সংকলন।

বিভিন্ন তথ্যপুঞ্জি অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, বহু সাধক, পণ্ডিত ও মনিষীদের কর্ম পদচারণা ছিল বিয়ানীবাজার উপজেলায়। লাউতার প্রতীথযশা সাংবাদিক সতীশ চন্দ্র দেব ছিলেন ”জন্মভূমি ও ‘শ্রীভূমি’ নামক দু’টি পত্রিকার সম্পাদক। ১৯২০ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত হতো জন্মভূমি পত্রিকা। এটি সে সময় জাতীয়তাবাদী সাপ্তাহিকী হিসেবে পরিচিত ছিল। আর ১৯২৬ সালে করিমগঞ্জ থেকে তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো ‘শ্রীভূমি’ পত্রিকা। সতীশ চন্দ্র দেব তাঁরই পিতার প্রতিষ্ঠিত ‘জনশক্তি’, ‘শ্রীভূমি’ এবং সুরমা পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভাগে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন। আরেক স্বনামধন্য সাংবাদিক ও কলামিস্ট ক্ষিরোদচন্দ্র দেব তৎকালিন সুরমা, জনশক্তি ও শ্রীভূমি পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন। বিয়ানীবাজার পৌরসভার পণ্ডিতপাড়ার তুষারপণ্ডিত ছিলেন ভারতের একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক। তিনি সেখান থেকে বিবিসি’র কলকাতা প্রতিনিধির দায়িত্বও পালন করতেন। বিয়ানীবাজারের কাকুরা গ্রামের কৃতি সন্তান রাধানাথ চৌধুরী ছিলেন ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ‘পরিদর্শক’ পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক।

বাঙালির গৌরবময় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েও বিয়ানীবাজারের কলম সৈনিকরা পিছ পা ছিল না। সেই সময় মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত হয় বেশ ক’টি পত্রিকা। ভাষা সৈনিক ও সাংবাদিক এইচ.সাদত খান ও আকাদ্দস সিরাজুল ইসলামের যৌথ উদ্যোগে আসামের করিমগঞ্জ শহর থেকে প্রকাশিত হতো ‘সাপ্তাহিক মুক্তবাংলা’ নামক পত্রিকা। এ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম এবং সা’আদত খান ছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি। পত্রিকায় তাঁর ছদ্মনাম ছিল আবুল হাসনাত(এ.এইচ)। এ.এইচ. সা’আদত খান ছিলেন ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। তিনি ১৯৫৩ সনে প্রকাশিত নওবেলাল পত্রিকার ঢাকার দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৫৭ সনে তিনি ‘দেশের ডাক’ নামে সিলেট থেকে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। ১৯৫৭-৬৮ ইংরেজী পর্যন্ত দৈনিক অবজারভার ও দৈনিক সংবাদ পত্রিকায়ও সা’দত কগান সিলেট প্রতিনিধির দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন।
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ছােটদেশ গ্রামের সাংবাদিক মােহাম্মদ আব্দুল বাসিত এর সঞ্চালনায় ভারতের করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক জয়বাংলা’। তিনি পত্রিকার সহকারি সম্পাদক ও ‘সােনার বাংলা’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও আলীনগরের আব্দুল মতিন চৌধুরী সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ’ এবং দেউল গ্রামের মােস্তফা আল্লামা সম্পাদিত ‘জন্মভূমি’ পত্রিকা বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতার ইতিহাসকে সমৃদ্ধি দিয়েছে।

বিয়ানীবাজারের মাথিউরার নিভৃত পল্লীর শব্দ সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম। তাঁর সাংবাদিকতা শুরু দৈনিক আজাদ পত্রিকার মধ্য দিয়ে। তিনি দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালিন সময় আসামের করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত “মুক্ত বাংলা” সাপ্তাহিক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। তিনি ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ, পয়গাম, পূর্বদেশ, মাহে নও, মাসিক মােহাম্মদী, সওগাত ও আল-ইসলাহ পত্রিকা ও সাময়িকীতে লেখালেখি করতেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থঃ নয়া দুনিয়া, সাবুর দুনিয়া, যুগল, রাক্ষুসে বন্যা এবং নীরব নদী, পঞ্চাবিংশতি ও চালচিত্র, মাটির চেরাগ, সােনার বাংলা, বন্দী জীবনের কিছু কথা, কারাগার থেকে বেরিয়ে। তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে ‘আকাদ্দস সিরাজ ইসলাম রচনাবলী”।

কসবা গ্রামের কৃতি সন্তান আব্দুল হাকিম তাপাদার একজন শক্তিধর লেখক ও সাংবাদিক। তিনি সাপ্তাহিক যুগভেরী, আল ইসলাহ, দৈনিক জালালাবাদ ও দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় কাজ করেছেন। সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকায় ‘যষ্টিমধু’ কলাম লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। প্রবীণ সাংবাদিক সিলেট প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি বোরহান উদ্দিন খান “হিং টিং ছট” শিরোনামে লিখনি দিয়ে একজন নিয়মিত কলাম লিখক হিসেবে সংবাদপত্র জগতে নিজ আসন প্রতিষ্ঠা করেন। শালেশ্বর গ্রামের বাহাউদ্দিন ছিলেন একজন স্বনামধন্য প্রবীণ সাংবাদিক। তিনি যথাক্রমে দৈনিক সিলেট বাণীর প্রধান সম্পাদক ও ইংরেজী দৈনিক মর্ণিং সান পত্রিকায় দীর্ঘদিন বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

সিলেটী ভাবুকদের রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ-শব্দ দর্শনে কিংবা সৃষ্টিকর্মে সাংবাদিক মােহাম্মদ আব্দুল বাসিত একটি উজ্জ্বল নাম। রম্য রচনা, ব্যঙ্গ লিখায় তিনি যেমনি ছিলেন পারদর্শী তেমনি সংবাদপত্রের কলামিস্ট হিসেবেও ছিলেন পাঠক নন্দিত। বাউল প্রকৃতির ও বিদ্রোহী স্বভাবের আব্দুল বাসিত যাটের দশকে পূর্ব বাংলার মফস্বল এলাকায় ইত্তেফাক সাংবাদিক হিসেবে সাংবাদিকতায় পা রাখেন। টানা তিন দশকের সাংবাদিকতায় তিনি ঢাকা, সিলেট, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেছেন নানা সংবাদপত্রে। ছাত্রাবস্থায় তাঁর শারীরবৃত্তে দেখা দেয় বিশৃঙ্খল দংশন। তাই তিনি বধির সাংবাদিক হিসেবে সর্বমহলেই ছিলেন পরিচিত। বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব-এর সম্পাদনায় ও প্রকাশনায় ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে মােহাম্মদ আব্দুল বসিত-এর সিলেট বিষয়ক কিছু মৌলিক রচনা নিয়ে “মােহাম্মদ আব্দুল বাসিত রচনাবলীঃ সহস্র বিস্মৃতিরাশি”‘ নামে একটি পুস্তিকা বের হয়।

বিয়ানীবাজারে বাহিরে অবস্থান করেও সিলেট থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত “দৈনিক আজকের সিলেট” এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি লোকমান আহমদ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত “সাপ্তাহিক প্রহর” সম্পাদক এম.এ.তারিক (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি) সাংবাদিকতার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়াও লাউতা গ্রামের ডা: নিবেদিতা দাস পুরকায়স্থ ছিলেন একজন লেখক ও সাংবাদিক। তার ছােট বোন রাখি দাস পুরকায়স্থ (ন্যাপনেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য’র স্ত্রী) দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় ‘নন্দিনী মালিয়া’ ছদ্মনামে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তাদের সম্পাদনায় ‘চিহ্ন’ নামের একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হতো।

পরবর্তীতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা পেশায় যারা নিয়োজিত থেকে বিয়ানীবাজারকে গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন তাদের মধ্যে দৈনিক যুগভেরী পত্রিকার কবি শামসাদ হুসাম, দৈনিক সংবাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান শহীদুল ইসলাম, প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকার সাবেক স্টাফ রিপাের্টার ও প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার চিফ রিপোর্টার আজিজুল পারভেজ, বর্তমানে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর রেজওয়ান আহমদ (দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি), দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার স্টাফ রিপাের্টার শাহজাহান কমর প্রমুখের কর্মনাম উল্লেখযোগ্য।

আশির দশকের প্রথমদিকে সাংবাদিকতায় আসেন আব্দুল হাছিব, আব্দুর রউফ খান মিষ্ঠু, মিসবাহ উদ্দিন, রণজিৎ চক্রবর্তী, হেলাল উদ্দিন, আব্দুর রহীম, আব্দুল আজিজ, আলী ঈসমাইল, দেলোয়ার হোসেন জিলন, কবি ফজলুল হক, শাকুর মজিদ, খালেদ জাফরী(পরবর্তীতে প্রেসক্লাব সভাপতি) প্রমুখ।

এদিকে খালেদ জাফরী’ ও ফারুক যোশী’র সম্পাদনায় “বিয়ানীবাজার পরিক্রমা-১ (প্রামাণ্য গ্রন্থ) ও খালেদ জাফরী”র সম্পাদনায় প্রকাশিত “বিয়ানীবাজার পরিক্রমা-২ বিয়ানীবাজারের উৎস অনুসন্ধানের এক মাইলফলক। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘বাঙালি’ ও ‘ঠিকানা’ পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন সাংবাদিক আব্দুর রউফ খান মিষ্ঠু, মো. মিসবাহ উদ্দিন ও নাজমুল ইসলাম হেলাল। আব্দুর রউফ খান মিষ্ঠু বাংলাদেশ ফিরে বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০১১ পর্যন্ত আমৃত্যু এ দায়িত্ব পালন করেন। তবে যারা এ পেশায় ছিলেন, সময়ের ব্যবধানে অধিকাংশই আর এ পেশায় এখন নেই।

কলামিস্ট আতাউর রহমান এর লেখালেখি শুরু ১৯৮৩ সনে। তিনি কাজ করেন ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক প্রতিশ্রুতি, দৈনিক রূপালী, বাংলাবাজার পত্রিকা, দৈনিক মানবজমিন, সাপ্তাহিক যুগভেরী, দৈনিক আজকের সিলেট, দৈনিক জালালাবাদ সহ স্থানীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায়। ২০০৫ সন থেকে ২০১১ পর্যন্ত তিনি একাধারে বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১২ সনে প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ২০২০ পর্যন্ত দায়িত্বরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিয়ানীবাজার উপজেলার দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্বরত। ২০২৩ সনে তিনি বিয়ানীবাজার উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থঃ পঞ্চখণ্ডের পথ ও পথিকৃৎ (তথ্যগ্রন্থ), একুশ থেকে স্বাধীনতা, সৃজনী ও অনির্বাণ একুশ(সম্পাদিত), বিয়ানীবাজার সংলাপ (তথ্য গ্রন্থ), জাগরণ(তথ্যগ্রন্থ), আফতার আলী হেডমাস্টার সম্মাননা গ্রন্থ (সম্পাদিত) ও মাধ্যমিক স্তরে পঠিত Learners’ Basic English Grammar & Composition এবং Basic Grammar For High School Learners’ নামক দুটি ইংলিশ গ্রামার বই।

আশির দশকের শেষের দিকে বিয়ানীবাজারের সাংবাদিক অঙ্গনে যেন এক নতুন সূর্যোদয় ঘটে। এ সময় সাংবাদিকতা অঙ্গনকে যারা সমৃদ্ধি দিয়েছেন তারা হলেন কলামিস্ট ফারুক যোশী, কলামিস্ট আতাউর রহমান, ইত্তেফাক প্রতিনিধি বাবুল হোসেন, শাহজাহান কমর, জয়নাল আফসার, আজিজুল পারভেজ, আব্দুল কাদির মুরাদ, আলী আহমেদ বেবুল, আজহারুল ইসলাম, মাসুদ আহমদ চৌধুরী, হীরণ রোহী দাস, আনােয়ার হোসেন, আব্দুলাহ আল আনসারী প্রমুখ। কিন্তু জীবন জীবিকা ও বিদেশমুখীতার খপ্পরে পড়ে তাদের অনেকেই আজ আর সাংবাদিকতা পেশায় নেই। ফলে ক্রম প্রসারিত ধারায় আশানুরূপ উন্নতি আর ঘটেনি। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সকল রতি মহারতি নিজেদের স্বার্থে সময় সময় বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকদের ব্যবহার করেছেন। দেশের মফস্বল এলাকার প্রথম প্রতিষ্ঠিত বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব নামের প্রতিষ্ঠান দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে আশ্বাসের বাণী ছাড়া কিছুই পায়নি। আজও প্রেসক্লাবটি তার নিজস্ব কোন ঠিকানা খুঁজে পায়নি। ফলে বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক ক্লাবের পরিত্যক্ত ঘরটি সংস্কার করে অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছে।

সংবাদপত্র হচ্ছে- ৪র্থ রাষ্ট্র’। সংবাদপত্রে রাষ্ট্র সরকার-জনগণের আবহমান কালের প্রবহমান ইতিহাস, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ঘটনার চলন্তিকাই সংবাদপত্রে প্রকাশ পায়। সংবাদপত্রে যারা কাজ করেন তাদেরকেই বলা হয় সাংবাদিক। সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। সাংবাদিকরা হচ্ছে সত্যের বাহক ও যুগের দূত। সাংবাদিকরা মুক্তচিন্তা ও বিবেক শাসিত হয়ে সত্যেকে খুঁজেন। তাঁদের শব্দের গাঁথুনিতে সজ্জিত হয় সংবাদপত্র নামক শিল্প। এমন একটি মহৎ পেশা প্রসঙ্গে বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতার তালিকা টানতে গিয়ে দু’টানায় পড়তে হয়। কারণ নিবেদিত সাংবাদিকদের পাশাপাশি এমনও সাংবাদকর্মী আছেন যারা পত্রপত্রিকায় দু’একটি ফিচার কিংবা টুকটাক দু’চার লাইনের নিউজ লিখে কিংবা ফেসবুকে কপিপেস্ট করে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে থাকেন। আর স্থানীয় কোন নির্বাচন এলে সাংবাদিকদের প্লে-কার্ডে সামাজিক মাধ্যম সয়লাব হতে দেখা যায়। এসবের মাঝে প্রকৃত সাংবাদিক যাচাই-বাছাই করা নি:সন্দেহে একটি দূরূহ কাজ। এরকম অবস্থায় এ নিবন্ধের বস্তুনিষ্ঠতা বা যথার্থতা কতটুকু সাফল্যের আলো দেখবে তা বলা মুশকিল। এ বিচারের দায়িত্ব পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।

মানুষের চোখ সবই দেখে; কিন্তু চোখের ভেতরে যখন ক্ষুদ্র পোকা প্রবেশ করে তখন ভেতরের থাকা পোকাটি চোখ আর দেখতে পায় না। এ নিবন্ধ লিখতে গিয়ে আমার অবস্থাও তাই। এক্ষেত্রে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি কামনা ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। এ নিবন্ধটি যেহেতু বিয়ানীবাজারের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে। তাই সঙ্গত কারণে সাহিত্যাঙ্গনের পূর্ণাঙ্গ আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। ভিন্ন কোন প্রবন্ধে সাহিত্যাঙ্গন নিয়ে হয়তো আলোচনা করা যাবে।

যা হোক, বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতা অঙ্গনে নব্বইর দশকে যারা যোগ দিয়েছিলেন সেই কলম সৈনিকরা হলেন- কামরুল আম্বিয়া, রেজওয়ান আহমদ, আব্দুল খালিক, এম হাসানুল হক উজ্জ্বল, আব্দুর রহিম শামীম, এম আনােয়ারুল ইসলাম অভি, এম সাত্তার আজাদ, শরীফুল হক মঞ্জু, সজিব ভট্টাচার্য, রাজু ওয়াহিদ, এম.এ.মুকিত, খছরুল ইসলাম, আব্দুল ওয়াদুদ, এনায়েত হোসেন সােহেল, মিলাদ মাে. জয়নুল ইসলাম (বর্তমান প্রেসক্লাব সম্পাদক), ছাদেক আহমদ আজাদ, মাছুম আহমদ, মো. জাকির হোসেন, মো. জহির উদ্দিন প্রভাষক, শাহীন আলম হৃদয়, লুৎফুর রহমান, হাসান শাহরিয়ার, ফয়সল মাহমুদ, দেলোয়ার হোসেন, শাবুল আহমদ, আহমদ ফয়সাল, ফুজেল আহমদ, শামছুর রহমান সুমেল, পলাশ আফজাল, মনােয়ার হোসেন লিটন, সুয়াইবুর রহমান স্বপন, শিপার আহমদ পলাশ, সুফিয়ান আহমদ ও সুজন আহমদ-সহ নাম না জানা অনেকেই। তাদের অনেকেই ভিন্ন পেশায় গমন ও প্রবাসের জীবন বেঁচে নেয়ায় এ পেশা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন।

পত্রিকার চাহিদা বেড়েছে। সাংবাদিকদের সংখ্যাও বেড়েছে। সমগ্র দেশের ন্যায় বিয়ানীবাজারের মফস্বল থেকেও পত্রিকা বের হয়। প্রথমদিকে নিয়মিত বের হলেও এখন আর কাগজের গন্ধ মিলে না। এ পর্যন্ত বিয়ানীবাজারে সাংবাদিক এনায়েত হোসেন সােহেল কতৃক বিলুপ্ত সাপ্তাহিক পঞ্চখণ্ড দর্পণ, মিলাদ মাে. জয়নুল ইসলাম কতৃক সাপ্তাহিক দিবালোক(পরবর্তীতে হাসান শাহরিয়ার) বের হলেও প্রকাশকদের স্বকীয়তার কারণে পত্রিকাটির তৎপরতা এখন চোখে পড়ে না। দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিক ছাদেক আহমদ আজাদ কতৃক সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক বিয়ানীবাজার বার্তা’ পত্রিকাটিও এখন অনিয়মিত। বিয়ানীবাজারের সংবাদশিল্পে ছাদেক আজাদের পত্রিকা প্রকাশনার উদ্যোগ ছিল প্রতিদানযোগ্য। আর মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম এর সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক আগামী প্রজন্ম’ প্রচারে শীর্ষে থাকলেও এখন নিয়মিত প্রকাশনার চেয়ে অনলাইন ভার্সনে পত্রিকা চলছে। একই ধারা অনুসরণ করে চলেছে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আব্দুল বাসিত টিপু সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক নবদ্বীপ’, সাংবাদিক মাসুম আহমদ সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক সম্ভাবনা’ পত্রিকা। এখানে ঐতিহাসিক কারণে আরেকটা নাম উচ্চারণ না করলে অন্যায় হবে। তিনি হলেন, বিয়ানীবাজারের নিউজপেপার এজেন্সীর প্রোপাইটার মরহুম ফরিদ উদ্দিন আহমদ। মূলতঃ তিনিই বিয়ানীবাজারের সংবাদপত্র ব্যবসার দিকপাল ছিলেন। যার উৎসাহ উদ্দীপনায় বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতা অঙ্গনে জাগরণ এসেছিল।

আশির দশকে বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব’র উন্মেষ হলেও বিভিন্ন আঞ্চলিকতাবাদ, সাংগঠনিক ঘাত-প্রতিঘাত ও সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানটির শঙ্কা ও গতিধারা আগেও তেমন কুসুমাত্তীর্ণ ছিল না। ২০২১ সনে এসেও সেই টানাহেঁচড়া অব্যাহত আছে। স্বকীয়তা ও ঐক্যের স্বার্থে এ ধারা কোনভাবেই শুভকর্ম বহন করে না। ঐক্যের ছাতার নিচে পদ-পদবী সব সময় সম্মানের। আসন ধরে রাখতে হয় ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতা দিয়ে। বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব এর বর্তমান নেতৃবৃন্দকে স্বীয়কর্ম দিয়ে ঐক্যের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। সংবিধান ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। তবে প্রকৃত সাংবাদিকরা যেন প্রেসক্লাবের বাহিরে না থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখা উচিত। ভুলে গেলে চলবে না যে, অট্টালিকার প্রাচুর্যের চেয়ে ঐক্যের কুঁড়েঘরই সকলের জন্য সম্মানের ও গর্বের।

সেই ধারাবাহিকতায় এসে হালআমলে বিয়ানীবাজারের সাংবাদিকতায় ২০২১খ্রি. অবদি আরও যারা যুক্ত হয়েছেন, তারা হলেন- আবু তাহের রাজু (বাংলা টিভি), সামিয়ান হাসান (আমাদের সময়), তোফায়েল আহমদ (জালালাবাদ), এম. এ. ওমর (নতুন দিন), সৈয়দ মুনজের হোসেন বাবু (ম্যাপ টিভি), জসিম উদ্দিন (আমার সংবাদ), সাহেদ আহমদ, এহসান করিম খোকন(জনতার টিভি), আবুল হাসান (দিবালোক), তাজবীর আহমদ ছাইম (যায়যায়দিন), মিছবাহ উদ্দিন (শুভ প্রতিদিন), সাইদুল ইসলাম (৭১ বাংলা), শহিদুল ইসলাম সাজু (একাত্তর), আহমদ রেজা (বিয়ানীবাজার নিউজ২৪.কম), ইমাম হাসনাত সাজু (দিবালোক), আহমদ এহসানুল কাদির (বিয়ানীবাজার টিভি), আমিনুল হক দিলু (আজকের সিলেট) প্রমুখ।

শেষ কথা, দেশ জাতি ও জনমত গঠনে সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিহার্য। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে গিয়ে কেউ কেউ শারিরিকভাবে হন নিগৃহীত। কেউ কেউ স্বার্থান্বেষী মহলের আক্রমণের শিকার হন। কারো কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক হামলা-মামলার ঘটনাও ঘটে। কারো চাকুরির উপর নেমে আসে ঘাত-প্রতিঘাত। এভাবে নানা ছলছাতুরির কুটকৌশলে হয়রানির শিকার হন মফস্বল সাংবাদিকরা। এ মহৎ পেশায় বিভাজন কাম্য হতে পারে না। কে ছোট সাংবাদিক, আর কে বড় সাংবাদিক, তা না ভেবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঐক্য ও বস্তুনিষ্ঠতা। নচেৎ ঘুণেধরা এ সমাজ ব্যবস্থায় যাহা কিছু অশুভ, অকল্যাণকার তা প্রগতির স্বাভাবিক গতিধারাকে ব্যাহত করবেই।
মনে রাখবেন, সাংবাদিকদের ক্ষেত্র হচ্ছে সংবাদপত্র। যেখানে মেধা ও মনন বিকাশের চর্চা হয়, সেখানকার সৌকার্য্য বিনাশ করা কলম সৈনিকের কাজ নয়। পত্র-পত্রিকা তদারকি যিনি করেন তিনি সম্পাদক। সম্পাদককে অবতীর্ণ হতে হয় বিচারকের ভূমিকায়। কিন্তু বিচারক যদি আইন-কানুন বিষয়ে অযোগ্য হন, ব্যক্তি জীবনে অসৎ হন; তাহলে বিচারপ্রার্থী মানুষ যেমনি ন্যায়-বিচার পায় না, তেমনি সম্পাদক অযোগ্য হলে পত্রিকার লেখার মান অনুধাবন সহজতর হয় না।
সাংবাদিকগণ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন না, কিংবা কারো দালালির জন্য লিখেন না। কাউকে ফুল দিয়ে তোষামোদি করেন না। তিনি কলম দিয়ে সমাজকে জাগ্রত করে তুলেন। তার বত্যয় হলে সবচেয়ে বেশী যিনি ক্ষতিগ্রস্থ হন, তিনি হলেন সাংবাদিক। তাই, পাঠক বিভ্রান্ত হওয়ার মতো কোন কর্মই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কাম্য হতে পারে না।

লেখক_পরিচিতি:
Π মাস্টার ট্রেইনার,গবেষক,কলামিস্ট, গ্রন্থ লেখক ও প্রাক্তন সভাপতিঃ বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।